‘অবশেষে আমার মনে হচ্ছে, আমাদের কথা শোনা হচ্ছে। আর আমাদের সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য ভালো কিছু ঘটতে যাচ্ছে।’ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনের (জেনোসাইড) অভিযোগসংক্রান্ত শুনানি শুরু হওয়া প্রসঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন মোনাইরা (ছদ্মনাম)। তিনি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো নির্মম দমন-পীড়নে বেঁচে যাওয়া মানুষদের একজন।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যখন রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালায়, তখন এ রোহিঙ্গা নারীকে নিজের বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছিল।
মোনাইরা বলেন, সেই সহিংসতার সময় তাঁর ভাইকে সেনাসদস্যরা ধরে নিয়ে যায়, গুলি করে হত্যা করে ও তাঁর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেনাসদস্যদের হাতে তিনি নিজেও ধর্ষণের শিকার হন।
মোনাইরা বলেন, ‘আমার চোখের সামনেই শিশুদের আগুনে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল।’
গতকাল সোমবার জাতিসংঘের শীর্ষ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনসংক্রান্ত মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। মোনাইরার মতো রোহিঙ্গাদের অনেকের আশা, এর মধ্য দিয়ে বহুল আকাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার পথে তাঁরা অন্তত এক ধাপ এগোতে পারবেন।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছে গাম্বিয়া। মূলত ২০১৬ ও ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে এ মামলা করা হয়। ওই অভিযানের কারণে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
মোনাইরা বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই।’ শুনানিতে অংশ নিতে তিনি বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থিত শরণার্থীশিবির থেকে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে গিয়েছেন।
এটি গত এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) প্রথম কোনো জাতিগত নিধনসংক্রান্ত মামলার শুনানি। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে জাতিগত নিধনের অভিযোগগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সে ক্ষেত্রে এই শুনানি একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
এর মধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার করা একটি মামলাও রয়েছে।
গতকাল সোমবার শুনানির শুরুতে গাম্বিয়ার আইন ও বিচারমন্ত্রী দাউদা জ্যালো আদালতকে বলেন, এই মামলা আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বোধ্য তাত্ত্বিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাস্তব মানুষ, বাস্তব গল্প ও একটি বাস্তব মানবগোষ্ঠীকে ঘিরে মামলাটি করা হয়েছে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা হলো সেই মানবগোষ্ঠী, ধ্বংস করে দেওয়ার লক্ষ্যেই যাঁদের নিশানা করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছে—কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, মা, বাবা, ছেলে, মেয়ে, দাদা-দাদি।
জ্যালো আরও বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের জীবনকে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। তাঁদের এমন সহিংসতা ও ধ্বংসের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যা কল্পনা করাও কঠিন।
গাম্বিয়া আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিচার আদালতে তাদের প্রথম পর্যায়ের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে। দেশটির অভিযোগ, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিকভাবে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালিয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের গণহারে হত্যা, ধর্ষণ ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল, রোহিঙ্গাদের পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস করা।
দাউদা জ্যালো আদালতে বলেছেন, ‘আমরা হালকা ধরনের প্রস্তুতির ভিত্তিতে এ মামলা করিনি। বহু বছর ধরে অবমাননা ও নির্যাতনের শিকার হওয়া একটি অসহায় গোষ্ঠীর ওপর যে নৃশংস ও নির্মম নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করার পরই আমরা এই মামলা দায়ের করেছি।’
মিয়ানমার জাতিগত নিধন চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা ১৬ জানুয়ারি থেকে ২০ জানুয়ারির ভেতর তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে। নিপীড়নের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মানুষেরা এই মামলায় সাক্ষ্য দেবেন, যা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের জন্য বিরল ঘটনা। ২৯ জানুয়ারি শুনানি শেষ হবে।
এর আগে মিয়ানমারের ৮০ বছর বয়সী গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি আদালতে গিয়ে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে জাতিগত নিধনসংক্রান্ত অভিযোগের বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলেন। ওই সময় তিনি মিয়ানমার সরকারের ডি ফ্যাক্টো নেত্রী ছিলেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক সেনা অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। বর্তমানে সু চি সেনাবাহিনীর নির্দেশে আটক রয়েছেন। ২০২১ সালের ওই সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনা মিয়ানমারকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকের প্রেসিডেন্ট তুন খিন বলেন, কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আসা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হচ্ছে।
তুন খিন আরও বলেন, ‘এটি ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির দীর্ঘ পথে বড় এক অগ্রগতি।’
তুন খিন আঞ্চলিক রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিলের চেয়ারপারসন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
২০২০ সালে আইসিজে মিয়ানমারের ওপর জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী পদক্ষেপ জারি করেছিল। এর আওতায় রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনমূলক সহিংসতা রোধ ও অতীতের অপরাধের প্রমাণ সংরক্ষণ করতে মিয়ানমার সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, সেনাবাহিনী এখনো নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক গবেষক শায়না বাউচনার বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর উচিত ‘নৃশংস নির্যাতন ও দমনমূলক অব্যবস্থাপনার চক্র’ শেষ করা। তাঁর মতে, দেশগুলোর উচিত মিয়ানমারের জান্তাকে আইসিজে-নির্ধারিত অস্থায়ী ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে আইনগত বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে বাধ্য করা।
আইসিজেতে করা মামলাটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে নির্ধারণ করা হবে, মিয়ানমার জাতিগত নিধন (জেনোসাইড) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতি লঙ্ঘন করেছে কি না।
২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কৌঁসুলি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অপরাধের তদন্ত শুরু করেছিলেন। ২০২৪ সালে আইসিসির কৌঁসুলি মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধান মিন অং হ্লাইং–এর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়ে আবেদন করেন।
লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক অ্যান্টোনিয়া মালভি বলেন, ‘আমরা যখন সশস্ত্র সংঘাত, ন্যায়বিচারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা দেখছি, তখন ২০২৬ সালের শুরুতেই এমন একটি মামলায় বিচারকাজ শুরু হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু হতে পারে না।’
মালভি বলেন, ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে মামলার রায় আসতে পারে। তিনি আরও মনে করেন, যদি মিয়ানমারে বর্তমান পরিস্থিতিতে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না হয়, তবু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে থেকে যাবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

