রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জন্য ইরানের জনগণ যে ভয়াবহ মূল্য দিতেও প্রস্তুত, তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে। ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা আর চায় না; বরং তারা একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছে।
এই মনোভাবের চিত্র তুলে ধরেছে গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী প্ল্যাটফর্ম দ্য কনভারসেশন। তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গ্রুপ ফর অ্যানালাইজিং অ্যান্ড মেজারিং অ্যাটিটিউডস ইন ইরান’ (গামান) ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে এই জরিপ পরিচালনা করে। ইন্টারনেটভিত্তিক এই জরিপে পরিচয় গোপন রেখে ইরানের ভেতরে অবস্থানরত এক লাখের বেশি মানুষ বিভিন্ন ধাপে অংশ নেন। শুধু গত বছরের সেপ্টেম্বরে—ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের পর—মতামত দেন ৩০ হাজারেরও বেশি অংশগ্রহণকারী।
জরিপের বিভিন্ন ধাপের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখেছিলেন ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৫ শতাংশে। একই বছর নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়; ডিসেম্বর মাসে শাসন পরিবর্তনের পক্ষে মত দেন ৬০ দশমিক ১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।
পরবর্তী সময়ে এই সমর্থন কিছুটা ওঠানামা করে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে হার নেমে আসে ৪০ দশমিক শূন্যে এবং জুনে আরও কমে হয় ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আবারও তা বেড়ে ৪১ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
গামানের পরিচালক আম্মার মালেকি ও বোর্ড সদস্য পোয়ান তামিমি আরব দ্য কনভারসেশন-এ লিখেছেন, জরিপগুলো ধারাবাহিকভাবে একটি বিষয় স্পষ্ট করছে—কী চায় না, সে বিষয়ে ইরানিদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে। প্রদেশ, শহর-গ্রাম, বয়স ও লিঙ্গ নির্বিশেষে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, তারা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ভোট দেবেন না।
‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র থেকে কাঠামোগত পরিবর্তন ও রূপান্তর’-এর পক্ষে সমর্থন ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ। মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ২০২২ সালে এই হার কমে দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ২ শতাংশে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ২৫ দশমিক ২ শতাংশ হলেও পরের বছরের সেপ্টেম্বরে আবার কমে ২১ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে।
অন্যদিকে, ইসলামিক বিপ্লবের নীতি ও সর্বোচ্চ নেতার প্রতি সমর্থনও ক্রমাগত কমেছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে এই সমর্থন ছিল ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর তা নেমে আসে ১১ দশমিক ৪ শতাংশে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ নেতার পক্ষে মত দেন মাত্র ১১ দশমিক ৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।
এবারের বিক্ষোভে ভিন্ন বাস্তবতা-
জরিপের প্রতিটি ধাপেই ইরানের অর্থবহ অগ্রগতির প্রধান শর্ত হিসেবে শাসন পরিবর্তনের দাবি সবচেয়ে জনপ্রিয় অবস্থান হিসেবে উঠে এসেছে। মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ‘উইমেন, লাইফ, ফ্রিডম’ আন্দোলনের সময় এই দাবি বিশেষভাবে জোরালো হয়। ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের পরও শাসন পরিবর্তনের পক্ষে জনসমর্থন বাড়তে দেখা গেছে।
তবে এবারের পরিস্থিতি আগের বিক্ষোভগুলোর তুলনায় ভিন্ন। সাম্প্রতিক সংঘাতে একাধিক সামরিক কমান্ডার নিহত হওয়ায় শাসনব্যবস্থা সামরিকভাবে দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়েছে—রাষ্ট্র আর বাধ্যতামূলকভাবে হিজাব পরিধান কার্যকর করতে পারছে না। অর্থনৈতিক দিক থেকেও দেশটি চাপে রয়েছে; মুদ্রার মান দ্রুত অবমূল্যায়িত হচ্ছে।
ইরানের একটি বড় অংশের মানুষ মনে করছেন, নির্বাচন বা সংস্কারের চেয়ে বিক্ষোভ এবং বিদেশি চাপ বা হস্তক্ষেপই রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে বেশি কার্যকর হতে পারে। এ কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্প শাসকদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা গেছে।
সামনে কী হতে পারে-
বর্তমান বিক্ষোভকারীদের চোখে ইসলামী প্রজাতন্ত্র একটি দখলদার শক্তি, যা তাদের স্লোগানেই প্রতিফলিত হচ্ছে—‘আমাদের শত্রু এখানেই, আমেরিকা নয়’ কিংবা ‘গাজা নয়, লেবানন নয়, জীবন দেব শুধু ইরানের জন্য’।
এই প্রেক্ষাপটে আবার আলোচনায় এসেছেন নির্বাসিত সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভি। ‘সবার আগে ইরান’ স্লোগানের সঙ্গে তাঁর জনপ্রিয়তার যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। গামানের ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের জরিপে দেখা যায়, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অংশগ্রহণকারী তাঁকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন, আরেক-তৃতীয়াংশ তীব্র বিরোধিতা করেন। বাকি অংশটি আংশিক সমর্থন বা বিরোধিতা করেন অথবা কোনো অবস্থান নেননি।
চলমান আন্দোলনে পাহলভিপন্থি স্লোগানের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, তিনি মধ্যপন্থি বা অনিশ্চিত অংশের কিছু মানুষকে আকর্ষণ করতে পারছেন। তবে তাঁর জনপ্রিয়তা সব এলাকায় সমান নয়। কুর্দি, আজেরি তুর্কি ও বালুচ অধ্যুষিত প্রদেশগুলোতে সমর্থন তুলনামূলকভাবে কম।
জরিপে বিকল্প রাজনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামো নিয়েও স্পষ্ট ঐকমত্য পাওয়া যায়নি। ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের পর পরিচালিত জরিপে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন ২০ দশমিক ৯ শতাংশ, রাজতন্ত্রের পক্ষে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ২০ শতাংশ। তবে ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, বর্তমান ব্যবস্থার বিকল্প কী হতে পারে—সে বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই।
এর অর্থ, ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করতে সক্ষম যে শক্তিই সামনে আসুক না কেন, তাদের প্রস্তাবিত শাসনমডেল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে বোঝাতে পারাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
জরিপে আরো দেখা গেছে, ইরানিদের বড় অংশ—প্রায় ৮৯ শতাংশ—একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা চায়। তবে রাজনৈতিক উদারনীতির প্রতি সমর্থন তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ২০২৪ সালে ৪৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মত দেন, সংসদ ও নির্বাচন ছাড়াও একজন শক্তিশালী নেতা দেশ পরিচালনা করতে পারেন। উচ্চশিক্ষা না থাকা জনগোষ্ঠী এবং রাজতন্ত্রপন্থিদের মধ্যে এই প্রবণতা আরো বেশি।
আম্মার মালেকি ও পোয়ান তামিমি আরব লিখেছেন, এই উদারনৈতিক ঘাটতি মোকাবিলায় জরিপের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। জাতীয়তাবাদ শাসনব্যবস্থা উল্টে দেওয়ার মতো শক্তিশালী বিপ্লবী শক্তি তৈরি করতে পারে। তবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতনের পর দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে ইরানের সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক বৈচিত্র্যকে একটি সত্যিকারের মুক্ত রাষ্ট্রের স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করতেই হবে।

