দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে যুদ্ধ–পরবর্তী গাজা নিয়ে একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি মাস্টারপ্ল্যান আছে। কোনো প্ল্যান বি নেই।’
গত বৃহস্পতিবার দাভোসে দেওয়া ওই উপস্থাপনায় কুশনার স্পষ্ট করে বলেন, হামাস নিরস্ত্র না হলে গাজার জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ সম্ভব হবে না। ট্রাম্পের গাজা বিষয়ক ‘শান্তি পর্যটন’ সনদে স্বাক্ষরের ঠিক পরপরই তিনি এই পরিকল্পনা প্রকাশ করেন।
কী আছে কুশনারের গাজা পরিকল্পনায়
কুশনারের উপস্থাপনায় গাজাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়। এতে রয়েছে উপকূলীয় পর্যটন অঞ্চল, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, দুটি নতুন শহর, ১৮০টি আকাশচুম্বী ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা। এসব প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
উপস্থাপনায় গাজার একটি মানচিত্র দেখিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনার স্থান নির্ধারণ করা হয়। বলা হয়, সমুদ্র উপকূলে একটি বড় পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলা হবে, যেখানে ১৮০টি আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ সম্ভব। এর মধ্যে অনেকগুলোই হোটেল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
মিসরের সঙ্গে সীমান্তঘেঁষা গাজার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে একটি সমুদ্রবন্দর দেখানো হয়। বন্দর থেকে ভেতরের দিকে একটি বিমানবন্দরের স্থানও চিহ্নিত করা হয়। উল্লেখ্য, এর কয়েক মাইল দক্ষিণে আগে গাজা বিমানবন্দর ছিল, যা ২০ বছরেরও বেশি আগে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়।
নিউ রাফা’ ও নিউ গাজা
পরিকল্পনায় দুটি নতুন শহরের কথা বলেন কুশনার। একটি শহরের নাম দেওয়া হয়েছে ‘নিউ রাফা’, অন্যটি ‘নিউ গাজা’।
‘নিউ রাফা’ শহরে এক লাখের বেশি স্থায়ী আবাসিক ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি থাকবে ২০০টির বেশি স্কুল ও ৭৫টির বেশি চিকিৎসা সুবিধা। কুশনার জানান, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এই নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব বলে তিনি আশা করছেন। গাজার ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে ‘নিউ গাজা’ হবে একটি শিল্পকেন্দ্র। এখানে শতভাগ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কম্পিউটার দিয়ে তৈরি যেসব ছবি উপস্থাপন করা হয়, তাতে দোহা ও দুবাইয়ের মতো উপসাগরীয় মহানগরের আদলে গাজাকে দেখানো হয়।
বাস্তবায়ন ও বাস্তবতা
এই পরিকল্পনাকে বিশাল কর্মযজ্ঞ হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবায়নের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছিল সীমিত। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার, পর টানা দুই বছর ধরে গাজায় চালানো ইসরায়েলি হামলায় ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
কুশনার জানান, গাজার এই উন্নয়ন কাজে প্রথমে বিভিন্ন সরকার অর্থ সহায়তা দেবে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটনে একটি সম্মেলনের মাধ্যমে প্রাথমিক ঘোষণা আসতে পারে বলেও তিনি জানান।
তিনি বেসরকারি খাতকেও বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। কুশনার বলেন, এ ধরনের এলাকায় বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এটি ‘অসাধারণ বিনিয়োগ সুযোগ’। তিনি বিনিয়োগকারীদের মানুষের জন্য আস্থা রেখে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান।
প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
ফিলিস্তিনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কুশনারের উপস্থাপনায় এখনো ধীর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তবে সমালোচকরা বলছেন, ফিলিস্তিনিদের অসহায় অবস্থাকে পুঁজি করে এই পরিকল্পনার মাধ্যমে তাদের শোষণ করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন ইউরো-মেডিটেরানিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটর গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ফিলিস্তিনি রামি আবদু এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, এই পরিকল্পনা ফিলিস্তিনিদের স্বকীয়তা নির্মূলের একটি ছক।
গাজা নিয়ে কুশনারের এমন পরিকল্পনা এই প্রথম নয়। ২০১৯ সালে বাহরাইনে ‘ফ্রম পিস টু প্রসপারিটি’ শীর্ষক এক সম্মেলনে তিনি গাজা ও পশ্চিম তীরকে একটি প্রাণবন্ত বাণিজ্যিক ও পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করার কথা বলেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আসবে এবং অঞ্চলটি সমৃদ্ধ হবে।
এদিকে গাজার নতুন টেকনোক্রেটিক কমিটির প্রধান আলী শাত্ দাভোস থেকে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় বলেন, বর্তমান সময়কে বাস্তব কাজে রূপ দেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

