বিশ্ববাজারে সোনার দাম দ্রুত বাড়ছে। দুই দিন আগে প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি দাম ছাড়িয়ে গেছে ৫ হাজার ডলার। এ সময়ে ডলারের দামও কমেছে। বিশ্বের প্রধান ছয়টি মুদ্রার তুলনায় ডলারের মান এখন চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বিশ্বের আর্থিক নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী হাত হলো তার মুদ্রা ডলার। বিশ্বের বাণিজ্যের বেশির ভাগই এই মুদ্রায় হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সত্ত্বেও ডলারের মান কমলেও তিনি উদ্বিগ্ন নন। তার ভাষ্য, “ডলারের মান এখন অনেক উঁচুতে।” এর পেছনে রয়েছে কৌশলগত কারণ। খবর জানাচ্ছে রয়টার্স।
ডলারের মান কমার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার আরও কমাতে পারে—এমন প্রত্যাশা, শুল্কনীতি সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, নীতিনির্ধারণে অস্থিরতা এসব কারণে ডলারের দাম পড়ছে। পাশাপাশি ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের আশঙ্কা ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ঘাটতি বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে।
ডলারের দর কমলে মার্কিন রপ্তানিকারকদের সুবিধা হয়। পণ্য বিদেশি বাজারে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান না ডলারের মান খুব কমুক। তার লক্ষ্য, ডলার নিজের অবস্থানে থাকুক।
আইওয়ায় এক ভাষণের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, “ডলার দারুণ অবস্থায় আছে। ডলার ভালোই করছে।” যদিও তার মন্তব্যের পর ডলারের পতন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের সমান নির্ণয়কারী ইনডেক্স ৯৫.৫৬৬-এ নেমে এসেছে—এটি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন।
ট্রাম্প আরও বলেন, “চীন ও জাপানের সঙ্গে আমাকে একসময় প্রচণ্ড লড়াই করতে হতো। তারা সবসময় নিজেদের মুদ্রার মান কমাতে চাইত।” দীর্ঘদিন ধরে ডলার দুর্বল—এমন প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্য এসেছে।
সম্প্রতি ডলারের ওপর চাপ বাড়ার কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান যৌথভাবে মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে। লক্ষ্য, দুর্বল ইয়েনকে শক্তিশালী করা। ব্যবসায়ীরা এ সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর ইয়েনের দর দুই অধিবেশনে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ বেড়ে যায়। সাধারণত এ ধরনের পদক্ষেপকে সরকারি হস্তক্ষেপের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হয়।
নিউইয়র্কে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গ্লোবাল জি-১০ বৈদেশিক মুদ্রা গবেষণা ও উত্তর আমেরিকা ম্যাক্রো কৌশল বিভাগের প্রধান স্টিভেন ইংল্যান্ডার বলেন, “বিনিয়োগকারীরা সব সময় খুঁজে বেড়ান এমন প্রবণতা যা বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। যখন প্রেসিডেন্ট উদাসীন থাকেন বা সমর্থন দেন, ডলার বিক্রেতারা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন।”
ডলারের দুর্বলতার কিছু সুবিধাও আছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিদেশে অর্জিত মুনাফা ডলারে রূপান্তর করার সময় সাশ্রয়ী হয়। মার্কিন রপ্তানিপণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী হয়। ডলারে ঋণ নেওয়া দেশ ও করপোরেশনগুলোর চাপও কমে। নিউ জার্সি ভিত্তিক মানিকর্পের ট্রেডিং ও স্ট্রাকচার্ড প্রোডাক্টস বিভাগের প্রধান ইউজিন এপস্টাইন বলেন, “প্রশাসন দুর্বল ডলার চায়। এতে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সহজ হয়। ট্রাম্পের উদ্বেগের মূল কারণ বাণিজ্য ঘাটতি।”
কানেকটিকাটের গ্রিনউইচে অবস্থিত ইন্টারঅ্যাকটিভ ব্রোকার্সের বাজার কৌশলবিদ স্টিভ সসনিক বলেন, “দুর্বল ডলার হলো দুধারী তলোয়ার। একদিকে এটি বহুজাতিক কোম্পানির জন্য ভালো। অন্যদিকে আমদানিপণ্যের দাম বাড়ায়, মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে।”
বিশ্ববাজারে ২০২৫ সালে ডলারের দর ৯ শতাংশের বেশি কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে ডলার দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল। দেশের বাজারে ডলারের মান অনেক দিন ধরেই ১২২ টাকায়। বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে।

