উন্নয়নশীল দেশগুলোয় একসময় প্রধান ঋণদাতা হিসেবে যেটি পরিচিত ছিল, চীনের অবস্থান গত এক দশকে বদলে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দরিদ্র দেশগুলোতে চীনের নতুন ঋণ প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর পাশাপাশি প্রাক্তন ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ ক্রমেই বেড়েছে।
রয়টার্স ও ফাইন্যান্স ইন আফ্রিকার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চীনের ঋণ আফ্রিকায় কমছে। নতুন ঋণের তুলনায় দেশগুলো থেকে বহির্মুখী অর্থপ্রবাহ বাড়ছে।
উন্নয়নশীল দেশে অর্থায়ন সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ান ডাটার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ এখন নতুন অর্থপ্রাপ্তির চেয়ে চীনে ঋণ পরিশোধে বেশি অর্থ পাঠাচ্ছে। ফলে এসব দেশ বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
গত এক দশকে বহুপক্ষীয় ঋণদাতাদের নিট অর্থায়ন ১২৪ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে এই সংস্থাগুলো বৈশ্বিক নিট অর্থপ্রবাহের ৫৬ শতাংশ সরবরাহ করছে। ২০২০–২৪ সালের মধ্যে এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৯০০ কোটি ডলার।
ওয়ান ডাটার নির্বাহী পরিচালক ডেভিড ম্যাকনেয়ার বলেন, “এখন নতুন ঋণ কম আসছে। কিন্তু চীনের আগের ঋণগুলো পরিশোধ করতেই হচ্ছে। এ কারণে দেশগুলো থেকে বহির্মুখী অর্থপ্রবাহ বাড়ছে।”
চীনা অর্থায়নে সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে আফ্রিকায়। ২০১৫–১৯ সালের মধ্যে মহাদেশটি চীন থেকে ৩ হাজার কোটি ডলার পেয়েছিল। ২০২০–২৪ সালে আফ্রিকার দেশগুলো চীনে ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে।
বোস্টন ইউনিভার্সিটি ভিত্তিক গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি সেন্টারের তথ্যমতে, আফ্রিকায় চীনের ঋণপ্রবাহ গত এক দশকে দ্রুত কমেছে। ২০২০ সালের পর বার্ষিক ঋণ প্রতিশ্রুতি ৫০০ কোটি ডলারের নিচে নেমে এসেছে। ২০১২–১৮ সালের গড় বার্ষিক ঋণ ছিল এক হাজার কোটি ডলারের বেশি। ২০২৪ সালে ঋণ ছাড় আরও কমে ২১০ কোটি ডলারে নেমেছে। ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ঋণ ছিল ২ হাজার ৮২০ কোটি ডলার।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএইড ও অন্যান্য উন্নত দেশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন কমিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আফ্রিকার অর্থনীতিতে। বহির্মুখী অর্থপ্রবাহ বাড়ায় অঞ্চলটিতে অর্থায়নের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ডেভিড ম্যাকনেয়ার বলেন, “২০২৫ সালের তথ্য আসলে ওডিএ-র বড় পতন স্পষ্ট হবে। এ প্রবণতা আফ্রিকার জন্য নেতিবাচক। অনেক দেশের সরকার জনকল্যাণ ও বিনিয়োগের জন্য অর্থ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে। তবে এটি অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি বাড়াতে পারে। সরকারগুলো বাইরের ঋণের ওপর কম নির্ভরশীল হবে।”
ওয়ান ডাটার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী দ্বিপক্ষীয় অর্থায়ন ও বেসরকারি খাতের ঋণও কমছে। গত বছর ওডিএ কমেছে। ভবিষ্যতেও এ প্রবণতা তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি সেন্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকায় চীনের প্রভাব কমার মূল কারণ হলো বেইজিংয়ের বৈদেশিক অর্থনৈতিক কৌশলের পরিবর্তন। এখন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ঋণ দেয়ার বদলে বাণিজ্য, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কৌশলগত অংশীদারিত্বে গুরুত্ব দিচ্ছে চীন।
চীনা ব্যাংকগুলো ২০২৪ সালে আফ্রিকায় মাত্র ছয়টি প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে। আগ্রহের কেন্দ্র ছিল জ্বালানি, পরিবহন ও আর্থিক খাত। একই বছর ডলার-নির্ভরতা কমাতে ইউয়ান-ভিত্তিক ঋণ ব্যবহারে জোর দিয়েছে চীন।
২০২৪ সালে আফ্রিকার মাত্র পাঁচটি দেশ চীনা ঋণ পেয়েছে। দেশগুলো হলো অ্যাঙ্গোলা, কেনিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক কঙ্গো, সেনেগাল ও মিসর। বেইজিংয়ের কৌশলগত পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। চীন এখন তাদের বেছে নিচ্ছে যাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক, কম ঝুঁকিপূর্ণ বাজার ও স্পষ্ট মুনাফার সম্ভাবনা আছে।
২০২৪ সালে আফ্রিকায় কোনো প্রকল্পেই ১০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থায়ন হয়নি। এটি মহাদেশে চীনের বৃহৎ উন্নয়ন অর্থায়ন থেকে সরে আসার প্রবণতাকে নির্দেশ করে। ঝুঁকি কম খাতে মনোযোগ দেয়ায় বাণিজ্য, শিল্প, সেবা ও আইসিটি খাতে চীনা ঋণ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আফ্রিকার সঙ্গে চীনের সীমিত এবং বাছাইকৃত সম্পৃক্ততা ভবিষ্যতেও চলবে। বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের যুগ শেষের পথে। চীনের নতুন আর্থিক কৌশল আফ্রিকার সঙ্গে ছোট, লক্ষ্যভিত্তিক ও বাছাইকৃত সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

