যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই এক কড়া নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। দেশটি তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী ও তার আশপাশের এলাকায় লাইভ-ফায়ার সামরিক মহড়া চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মঙ্গলবার (নির্দিষ্ট তারিখ অপরিবর্তিত) ইরানের পক্ষ থেকে একটি নোটিশ টু এয়ারম্যান (নোটেম) জারি করা হয়। নোটেমে জানানো হয়, হরমুজ প্রণালী ও আশপাশের এলাকায় ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৫ হাজার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত সব ধরনের বিমান চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে। এর নিচে কোনো বিমান প্রবেশ করলে সেটিকে শত্রু লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে—এমন স্পষ্ট সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।
এই ঘোষণার সময়টাই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এর ঠিক এক দিন আগেই—২৬ জানুয়ারি—মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন, সঙ্গে ছিল আরও কয়েকটি রণতরীর বিশাল বহর। এই নৌবহর পৌঁছানোর পরদিনই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টকোম মধ্যপ্রাচ্যে বড় আকারের সামরিক বিমান মহড়ার ঘোষণা দেয়।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন নয়। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সেই শত্রুতা আরও গভীর হয়।
গত বছর জুন মাসে এই উত্তেজনা সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয়। ইরান একদিকে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—এই তিন পক্ষের মধ্যে টানা ১২ দিনের সংঘাতে ইরানের পরমাণু প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়। সেই সময় নিহত হন ইরানের কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা এবং পরমাণু বিজ্ঞানী, যা দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়।
যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ওই সংঘাত আপাতত থামলেও উত্তেজনার আগুন নিভে যায়নি। বরং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের ভেতরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নতুন করে পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে চলতি জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চলা এই বিক্ষোভের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ‘যে কোনো সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর’ হুমকি দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সেই হুমকির বাস্তব প্রতিফলন হিসেবেই জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে এশিয়া–প্রশান্ত অঞ্চল থেকে রওনা হয়ে ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় পৌঁছায় ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনসহ মার্কিন নৌবহর। এই বহরের উপস্থিতি ইরানের জন্য স্পষ্ট এক শক্তি প্রদর্শনের বার্তা বহন করে।
এর প্রতিক্রিয়ায় খুব বেশি সময় নেয়নি তেহরান। ২৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমান মহড়ার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয় এবং হরমুজ প্রণালীতে লাইভ-ফায়ার মহড়ার ঘোষণা দেয়। অনেকের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সরাসরি একটি প্রতিরোধমূলক বার্তা।
এই উত্তেজনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য এটি একটি কৌশলগত ‘লাইফলাইন’। প্রতিদিন এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবাহিত হয়।
হরমুজ প্রণালীতে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক তেলের দাম, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ইরানের এই সামরিক মহড়ার ঘোষণা শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক উদ্বেগও বাড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে, আকাশসীমা বন্ধ ও লাইভ-ফায়ার মহড়ার ঘোষণার মাধ্যমে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল—মধ্যপ্রাচ্যে চলমান শক্তির লড়াইয়ে তারা কোনোভাবেই পিছু হটতে রাজি নয়। এখন প্রশ্ন একটাই: এই উত্তেজনা কি কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নতুন করে বড় সংঘাতের দিকে এগোবে অঞ্চলটি?

