রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে মস্কোয় বৈঠক করেছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি আরো সুসংহত করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের ঠিক এক বছর কিছু আগে আল-শারার নেতৃত্বে বিদ্রোহী যোদ্ধারা সিরিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে। ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর আসাদ সিরিয়া ছেড়ে পালিয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নেন। সাবেক এই প্রেসিডেন্ট দীর্ঘদিন ধরে পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন।
সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রকাশ্যভাবে বাশার আল-আসাদের সরকারের পক্ষে অবস্থান নেন এবং তাকে সামরিক সহায়তা প্রদান করেন। ফলে সেই সময়ে পুতিন ও আল-শারা বিপরীত শিবিরে অবস্থান করছিলেন।
পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে আল-শারা সিরিয়ায় জাতীয় ঐক্য রক্ষায় সমর্থন দেওয়ার জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় রাশিয়া একটি ‘ঐতিহাসিক’ ভূমিকা রেখে এসেছে।
বৈঠকে পুতিন সিরিয়াকে স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে আল-শারার চলমান প্রচেষ্টার প্রতি তাঁর সমর্থন ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা পুনরুদ্ধারে আল-শারার অর্জনের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানান রুশ প্রেসিডেন্ট।
আল-শারা ক্ষমতায় আসার পর সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়ে মস্কোয় উদ্বেগ তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে বৈঠকের আগে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানান, সিরিয়ায় রুশ সেনা উপস্থিতির বিষয়টি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে। তিনি বলেন, সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল অঞ্চলে খমেইমিম বিমানঘাঁটি এবং তারতুস নৌঘাঁটিতে বর্তমানে রুশ সেনা মোতায়েন রয়েছে।
খবর অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের শুরুতে রাশিয়া কুর্দি নিয়ন্ত্রণাধীন সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কামিশলি বিমানঘাঁটি থেকে নিজেদের বাহিনী প্রত্যাহার করেছে। ফলে বিদেশের মাটিতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে রাশিয়ার হাতে এখন কেবল এই দুটি ভূমধ্যসাগরীয় সামরিক ঘাঁটি অবশিষ্ট রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে সিরিয়া মধ্যপ্রাচ্যে মস্কোর অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র। শীতল যুদ্ধের সময় থেকে এই সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন দামেস্কে বাথিস্ট শাসনব্যবস্থাকে—প্রথমে হাফিজ আল-আসাদ এবং পরে তাঁর ছেলে বাশার আল-আসাদের নেতৃত্বাধীন সরকারকে—ব্যাপক সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা প্রদান করেছিল।
তবে আল-শারা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার ভূমিকার বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়ে দেখিয়েছেন। ক্ষমতা দখলের পর গত অক্টোবর মাসে তিনি প্রথমবারের মতো মস্কো সফরে যান। সে সময় অতীতের শত্রুতা পাশ কাটিয়ে পুতিনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেন তিনি।
এদিকে বাশার আল-আসাদ ও তাঁর স্ত্রী বর্তমানে রাশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। রাশিয়ার কাছে আসাদকে সিরিয়ায় ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন আল-শারা। গত মাসে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্টের দমননীতির শিকার সিরীয় নাগরিকদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পুতিন সিরিয়ায় রাশিয়ার উপস্থিতি ধরে রাখতে আগ্রহী হবেন। বিশেষ করে এই মাসের শুরুতে আরেক ঘনিষ্ঠ মিত্র হারানোর পর বিষয়টি মস্কোর জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ মাসের শুরুতে মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করে নিয়ে যায়। মাদুরোও পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন।
সূত্র: আল-জাজিরা

