মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি জোরদার হওয়ার প্রেক্ষাপটে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ একটি নৌবহর মোতায়েনের পর পাল্টা শক্তি প্রদর্শনের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। এর অংশ হিসেবে আজ রোববার থেকে হরমুজ প্রণালিতে দুই দিনব্যাপী সরাসরি গুলিবর্ষণসহ সামরিক মহড়া চালানোর ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।
এই মহড়াকে ঘিরে হরমুজ প্রণালি আবারও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রে চলে এসেছে। ইরান আগেই সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে সতর্ক করে জানিয়েছে, রবি ও সোমবার এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে তারা সরাসরি গোলাগুলির মহড়া চালাবে। বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন একটি সংবেদনশীল করিডোরে এ ধরনের সামরিক কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচলের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই যায়, যা ইরান ও ওমানের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ইরানের ঘোষিত সামরিক মহড়ার কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ইতোমধ্যেই দেখা দিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রও কড়া অবস্থান নিয়েছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম ইরানের অভিজাত ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস—আইআরজিসিকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছে। তাদের বক্তব্য, হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের ‘অনিরাপদ কর্মকাণ্ড’ যুক্তরাষ্ট্র সহ্য করবে না। বিশেষ করে মার্কিন রণতরীর ওপর দিয়ে ইরানের ড্রোন বা যুদ্ধবিমানের উড্ডয়নকে তারা ‘লাল রেখা’ হিসেবে দেখছে।
সেন্টকম আরও জানিয়েছে, জাহাজের খুব কাছ দিয়ে ইরানি স্পিডবোটগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল বা সংঘর্ষের সম্ভাবনাও তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। এমন কোনো ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আগেভাগেই কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
এর মধ্যেই ইরান নিজেদের অবস্থান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছে। লেবাননের সংবাদমাধ্যম আল মায়াদিনকে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা আলি শামখানি বলেছেন, ইরানের প্রতিশোধ পরিকল্পনা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত ও উন্নত। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শত্রুপক্ষের যেকোনো আগ্রাসী বা শত্রুতাপূর্ণ ইঙ্গিতের জবাবে ইরান আনুপাতিক, কার্যকর ও প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত।
শামখানির ভাষায়, ইরানের বার্তা একেবারেই পরিষ্কার—দেশটির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে তারা বসে থাকবে না। এই বক্তব্য পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তেজনাকে আরও ঘনীভূত করেছে।
তবে একই সঙ্গে যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। তেহরান থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক রেসুল সেরদার আতাস জানিয়েছেন, ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তুরস্ক ছাড়াও কাতারসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলো উত্তেজনা প্রশমনে নীরব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেলপথের কেন্দ্রে এমন সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে এই উত্তেজনা কতটা দূর গড়ায়, তা এখন শুধু অঞ্চল নয়—পুরো বিশ্বের নজর কেড়ে নিয়েছে।

