উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইরানের সাধারণ মানুষ দিন কাটাচ্ছে ভয়ের ছায়ায়। তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে মার্কিন হামলার সম্ভাব্য গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ায় নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ, আতঙ্ক এবং অস্থিরতা বিরাজ করছে।
গত ৩০ জানুয়ারি রাত থেকেই এই থমথমে পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শহরের রাজপথে দৈনন্দিন জীবন আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হলেও, ঘরের ভেতরের দৃশ্য একেবারেই ভিন্ন। অনেক বাসিন্দা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য জানালার কাঁচ স্কচটেপ দিয়ে সিল করছেন, আবার কেউ কেউ বিশেষ কায়দায় ঘরকে ‘সুরক্ষা কক্ষ’-এর মতো প্রস্তুত করছেন সম্ভাব্য বোমা হামলার জন্য।
বাসিন্দাদের কথায়, সম্ভাব্য কোনো হামলার সময় সরকার সমর্থক বা বিরোধী—সবার জন্যই বিপদ এক। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা বোমা থেকে বেঁচে থাকার কৌশল, জরুরি প্রস্তুতির পরামর্শ এবং খাদ্য ও পানি মজুত করার নির্দেশনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
অনেকেই অন্তত ১০ দিনের শুকনো খাবার, পানি এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম জোগাড় করছেন। বয়স্ক বা দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্তরা তিন মাসের ওষুধ আগেভাগে কিনে রাখছেন। এই প্রস্তুতি সমাজের ভেতর একটা নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে—যেখানে আতঙ্ক এবং পূর্বপরিকল্পনা একে অপরের সঙ্গে জড়িত।
ইরানের ভেতরের এই উত্তেজনার প্রেক্ষাপটকে আরও জটিল করে তুলেছে দেশের অভ্যন্তরে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন। গত ডিসেম্বরে অর্থনৈতিক সংকট ও বিক্ষোভ দমন করতে সরকারি বাহিনীর অভিযান চালানো হয়, যার ফলে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। অধিকার গোষ্ঠীর হিসাব অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা সাড়ে ছয় হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের সঙ্গে বাইরের যুদ্ধের হুমকির মিলিত চাপ সাধারণ ইরানিদের জীবনে অচেনা উদ্বেগ এবং দিশাহীনতা তৈরি করেছে।
কিছু মানুষ মনে করছেন, মার্কিন হামলা হয়তো তাদের মুক্তি দেবে, আবার অভিজ্ঞ প্রবীণরা আশঙ্কা করছেন যুদ্ধ শুধু ধ্বংসই বয়ে আনবে। প্রবাসে থাকা কয়েক মিলিয়ন ইরানিও পরিবার-পরিজনকে ঘিরে গভীর উদ্বেগে রয়েছেন। যুদ্ধের কারণে ইন্টারনেট বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তাদের চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই অস্থির ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিকে অনেকে এক করুণ রসিকতা হিসেবে দেখছেন। ৩১ জানুয়ারি রাতের জন্য ইরানে হামলা হবে কি না তা নিয়ে জুয়া খেলার ওয়েবসাইটগুলোতে হাজার হাজার ডলারের বাজি বসানো হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম এই পরিস্থিতিকে ‘অন্যান্যদের বিনোদনের খোরাক’ হিসেবে অভিহিত করে ক্ষোভ প্রকাশ করছে।
একদিকে দেশের কঠোর শাসনব্যবস্থা, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাব—সব মিলিয়ে ইরানের সাধারণ মানুষ এখন এক অন্ধকার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। ঘরের জানালার কাঁচ সিল করা, শুকনো খাবার ও পানি মজুত করা—এই সব প্রস্তুতির মধ্যেই জীবনের নিরাপত্তা রক্ষার শেষ চেষ্টার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।

