উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি জোরদারের প্রেক্ষাপটে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সতর্ক করে বলেছেন, আমেরিকা যদি ইরানে সামরিক হামলা চালায়, তবে তা একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে। রোববার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন। সূত্র: মিডল ইস্ট আই
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান পারমাণবিক চুক্তিতে সম্মত না হওয়া এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের অভিযোগে হস্তক্ষেপের হুমকি বারবার দিয়ে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরই অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার নৌবাহিনীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
খামেনির উদ্ধৃতি দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, “আমেরিকানদের জানা উচিত, তারা যদি যুদ্ধ শুরু করে, তাহলে এটি কেবল সীমিত সংঘাত থাকবে না; বরং পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে।”
এই সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প দাবি করেন, একটি “বিশাল আরমাডা” ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর তথ্যমতে, বর্তমানে ওই অঞ্চলে ছয়টি ডেস্ট্রয়ার, একটি বিমানবাহী রণতরী এবং তিনটি উপকূলীয় যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে খামেনি বলেন, “[ট্রাম্প] নিয়মিত বলেন যে তিনি জাহাজ পাঠিয়েছেন। কিন্তু ইরানি জাতি এসব প্রদর্শনী দেখে ভীত হয় না। হুমকি দিয়ে ইরানকে বিচলিত করা যাবে না।”
তিনি আরো বলেন, ইরান কোনো দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন শুরু করতে চায় না। তবে কেউ যদি ইরানের ওপর আক্রমণ বা হয়রানি চালায়, তাহলে ইরানি জাতি তার জবাব কঠোরভাবেই দেবে।
এদিকে তেহরান জানিয়েছে, কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনো খোলা রয়েছে। তবে তারা এমন কোনো আলোচনায় বসবে না, যেখানে ইরানের প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা করা হবে। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা কেবল “ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ” আলোচনাতেই প্রস্তুত।
দেশটির ভেতরে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সাম্প্রতিক দমন-পীড়নের পর অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে। খামেনি এই আন্দোলনকে “অভ্যুত্থানের চেষ্টা” হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনাকারী গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করেই এই সহিংসতা চালানো হয়েছিল।
সরকারি পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, অস্থিরতার ফলে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার কর্মী সংবাদ সংস্থা ও একটি অধিকার সংগঠন দাবি করেছে, তারা ৬ হাজার ৭১৩ জন নিহত হওয়ার তথ্য যাচাই করেছে।
এদিকে মিডল ইস্ট আই সোমবার জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন “উচ্চ-মূল্যবান” কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডারের বিরুদ্ধে নির্ভুল হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। এসব কর্মকর্তাকে চলতি মাসের শুরুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহতদের জন্য দায়ী মনে করা হচ্ছে।
বিক্ষোভ দমনের অভিযোগের জেরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলে, এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের আইনপ্রণেতারা ইউরোপীয় সেনাবাহিনীর ওপর একই ধরনের তকমা আরোপ করেন।
যদিও উভয় পক্ষই সামরিক হুমকি ও সতর্কবার্তা বিনিময় করছে, তবু আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলেই ইঙ্গিত মিলছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানি শনিবার বলেন, “মিডিয়ায় যুদ্ধের যে চিত্র আঁকা হচ্ছে, বাস্তবে তার বিপরীতে কাঠামোগত সংলাপের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে।”
অন্যদিকে ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন যে সংলাপ চলছে, তবে আগের হুমকি প্রত্যাহার না করেই মন্তব্য করেছেন, “দেখা যাক কী হয়।”

