৩০ জানুয়ারির রাত নামার সঙ্গে সঙ্গেই ইরানজুড়ে এবং বিদেশে অবস্থানরত ইরানিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আতঙ্ক। দেশজুড়ে গুঞ্জন ওঠে—যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো মুহূর্তে ইরানে সামরিক হামলা চালাতে পারে।
তেহরানে বসবাসরত ৪৩ বছর বয়সী এক প্রকৌশলী, যিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখে মিলাদ নামে কথা বলেছেন- জানান, সেই রাতটি ছিল তার জীবনের অন্যতম ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। তার ভাষায়, “আমি পুরো রাত জেগে ছিলাম। ভোর পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যও ঘুম আসেনি। বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। শুধু অপেক্ষা করছিলাম—কখন বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাবে।”
৩১ জানুয়ারি সকালে তেহরানের এক পার্কে নিয়মিত ব্যায়াম শেষে ফিরে আসা ৬৮ বছর বয়সী সোহরেহ জানান, তাঁর সঙ্গে থাকা সবাই একই কথা বলছিলেন—সেই রাতেই হামলা হতে পারে।
বিদেশি হামলার ঘোর বিরোধী সোহরেহ বলেন, দীর্ঘদিনের দমন–পীড়নে মানুষ এখন যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলছে। অনেকেই মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তাঁর ভাষায়, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সহিংসতায় বিপর্যস্ত মানুষ এতটাই মরিয়া যে তারা আর বুঝতে পারছে না, কোনটা তাদের মঙ্গল আর কোনটা সর্বনাশ।
এক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হুমকি ইরানিদের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কাকে আরও বাস্তব করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবহরের শক্ত উপস্থিতি এবং ইসরায়েল ও সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় অস্ত্রচুক্তি ইরানের সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি, মানসিক চাপ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয় বাড়িয়েছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের একটি বাজার থেকে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক সংকটজনিত বিক্ষোভ দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সরকার নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে কঠোর দমন–পীড়ন চালিয়ে তা নিয়ন্ত্রণে আনে। এই সহিংসতার মানসিক ক্ষত এখনো সাধারণ মানুষ বহন করে চলেছে।
সরকারি হিসেবে, ওই দমন–পীড়নে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। তবে পশ্চিমা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, নিহতের সংখ্যা সাড়ে ৬ হাজার ছাড়িয়েছে এবং অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। যদিও আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা এখনো এই পরিসংখ্যান নিশ্চিত করেনি।
৩২ বছর বয়সী সরকারি কর্মচারী আরজু বর্তমান শাসনব্যবস্থার কট্টর সমালোচক। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে এক ধরনের নীরব আতঙ্ক জমে আছে। গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা মানুষকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। কেউ যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে না চাইলেও সবাই যেন প্রথম বিস্ফোরণের অপেক্ষায় রয়েছে।
আরজু জানান, তাঁর পাশের ভবনের এক বাসিন্দা জানালার কাচ সিল করে দিয়েছেন। তাকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, “যখন বোমা পড়বে, তখন কেউ সরকারি না বিরোধী—এই পার্থক্য করবে না।”
ইরানিরা মানসিক চাপ সামাল দিতে আপাত শান্ত থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সবার মনে একই প্রশ্ন—যুদ্ধ শুরু হলে কী হবে?

বিক্ষোভ দমনের সময় সরকার ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল। তিন সপ্তাহ পর সংযোগ চালু হতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে গেছে বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে বাঁচার নানা পরামর্শে। ফার্সি ভাষার প্ল্যাটফর্মগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধকালীন সতর্কতামূলক নির্দেশনা।
এই তালিকায় রয়েছে—১০ দিনের খাবার ও পানি মজুত রাখা, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম হাতের কাছে রাখা, পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখা, দ্রুত বের হওয়ার পথ খোলা রাখা, বিস্ফোরণের শব্দ শুনলে খোলা জায়গায় সরে যাওয়া অথবা দেয়ালের পাশে মাটিতে শুয়ে পড়া।
এই পরামর্শগুলোর উৎস স্পষ্ট নয়। এগুলো কারা ছড়াচ্ছে তা নিশ্চিত না হলেও এর প্রভাব সমাজে স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে।
আরজু জানান, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তিনি ইতোমধ্যে ১০ বোতল পানি ও কিছু সংরক্ষিত খাবার কিনে রেখেছেন।
কিডনি রোগে আক্রান্ত ৭৫ বছর বয়সী আমিন তিন মাসের ওষুধ আগেভাগেই কিনে রেখেছেন। তিনি বলেন, “এগুলো হয়তো গণমাধ্যমের আতঙ্ক, তবু সাবধানতা জরুরি। ভবিষ্যৎ কেউ জানে না।”
আমিন ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছেন। নতুন করে যুদ্ধের সম্ভাবনা তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই তিনি ধর্মতান্ত্রিক শাসনের বিরোধিতা করে আসছেন।
তিনি বলেন, বিপ্লবের পর তাঁর বহু সহযোদ্ধাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, আর এখন একই শাসনব্যবস্থা নতুন প্রজন্মকে হত্যা করছে। তবে শাসকদের প্রতি ঘৃণা থাকলেও যুদ্ধের প্রতি তাঁর ঘৃণা আরও গভীর। তাঁর ভাষায়, “যুদ্ধ আমাদের যা কিছু অবশিষ্ট আছে, সবকিছু ধ্বংস করে দেবে।”
এই ভয় শুধু ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির প্রায় ৪০ লাখ প্রবাসীও উদ্বেগে রয়েছেন। ১২ দিনের সংঘাতের মতো আবার ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেলে তারা দেশে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ হারানোর আশঙ্কা করছেন।
ফিনল্যান্ডে বসবাসরত ফাতেমা জানান, তিনি তাঁর বৃদ্ধ মা–বাবাকে নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তিত। আগের যুদ্ধে তাঁরা শহর ছাড়ার কোনো পরিবহন পাননি। ফাতেমা বলেন, তিনি মা–বাবাকে তেহরান ছাড়তে বললেও তারা কোথাও যেতে রাজি হননি। ফলে তিনি এক বন্ধুকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ও ওষুধ কিনে দিতে অনুরোধ করেছেন।
বর্তমানে ইরানের শহরগুলো আপাত শান্ত। দোকানপাট খোলা, গ্যাস স্টেশনে ভিড় নেই, শিশুদের স্কুলবাসের অপেক্ষায় দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালে জমে আছে গভীর উদ্বেগ।
২৭ বছর বয়সী ছাত্র সরোশ গত ১২ দিনের যুদ্ধে পরিবারসহ ইরানের উত্তরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, এখন গণ-আতঙ্ক না থাকলেও মানুষ মানসিকভাবে প্রস্তুত। তাঁর কথায়, “আগে আমরা জানতাম না যুদ্ধ কেমন। এখন সেই অভিজ্ঞতা আমাদের আছে।”
৪১ বছর বয়সী সাবা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সরকারের দমন–পীড়ন, প্রবাসী বিরোধী নেতাদের স্বার্থপরতা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে।

