যুক্তরাষ্ট্রের চাপের প্রেক্ষিতে রাশিয়া জানিয়েছে, ভারত যেকোনো দেশ থেকে তেল কেনার স্বাধীনতা রাখে। ভারতের তেল আমদানি নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে রাশিয়ার স্পষ্ট বার্তা হলো—নয়াদিল্লি কেবল রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হওয়া ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। তবে ভারতের তরফে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ইকোনমিক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, রাশিয়া মনে করায়, ভারত অতীতেও বিভিন্ন দেশ থেকে খনিজ তেল কিনেছে।
রাশিয়ার ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, “ভারত শুধু রাশিয়া থেকে তেল কিনে না। তারা যখন চায়, ভেনেজুয়েলা বা অন্য কোনো দেশ থেকেও কিনতে পারে।” একদিন আগে পেসকভ জানিয়েছিলেন, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে—এমন কোনো বক্তব্য নয়াদিল্লি দেয়নি।
ট্রাম্পের দাবি, ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক কমানো হয়েছে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির অংশ হিসেবে ভারতের পণ্যের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশে নেমেছে। ট্রাম্প আরও জানিয়েছেন, ভারত এখন থেকে ভেনেজুয়েলার তেল কিনতে পারে।
ভারতের রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরশীলতা:
২০২১ সালের আগে ভারতের রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের অংশ ছিল খুবই নগণ্য, মাত্র ০.২ শতাংশ। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে বড় রকমের পরিবর্তন আসে। তখন ভারতের জন্য রাশিয়ার ছাড়মূল্যের অপরিশোধিত তেল একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়।
ভারতের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৮ শতাংশই আমদানি করা হয়। পরিশোধন শেষে তা পেট্রল, ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানিতে রূপান্তরিত করা হয়। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল আসে রাশিয়া থেকে। এক সময় দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি রুশ তেল আমদানি করলেও, ডিসেম্বর মাসে তা কমে ১৩ লাখ ব্যারেলে দাঁড়ায়। চলতি মাসেও প্রায় একই পর্যায়ে থাকার অনুমান করা হচ্ছে। (সূত্র: এনডিটিভি)
গত বছরের মার্কিন শুল্কের কারণে ভারতের রাশিয়ার তেল আমদানি কিছুটা কমে। কেপলারের তথ্যানুসারে, জানুয়ারির প্রথম তিন সপ্তাহে ভারতের রুশ তেল আমদানি দৈনিক গড় ১১ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দৈনিক আমদানি ছিল ২০ লাখেরও বেশি।
ন্যাশনাল এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ডের বিশেষজ্ঞ ইগর ইউশকভ মনে করেন, ভারতীয় শোধনাগারগুলোর পক্ষে রাশিয়ার তেল পুরোপুরি বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের শেল তেল হালকা প্রকৃতির। রাশিয়ার ইউরালস তেল ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ। তাই একে একে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সহজ নয়। আর এতে অতিরিক্ত খরচও বৃদ্ধি পাবে।”
ইউশকভের ভাষায়, ভারত সাধারণত দৈনিক ১৫–২০ লাখ ব্যারেল রাশিয়ার তেল সরবরাহ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই কোটা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, ট্রাম্পের মন্তব্য মূলত রাজনৈতিক-বাণিজ্য আলোচনায় জয়ী হওয়ার ইঙ্গিত মাত্র।
তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালে যখন রাশিয়া ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ছেড়ে ভারতমুখী হয়েছিল, তখন দেশের দৈনিক উৎপাদন কমে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রল ও ডিজেলের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

