মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা যখন নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে, ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা দিয়েছে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক কমিশনের শীর্ষ নেতারা। তাঁদের ভাষ্য—ওয়াশিংটন যদি সামান্যতম কৌশলগত ভুলও করে, তাহলে এবার ইরানের প্রতিক্রিয়া আগের মতো সীমিত থাকবে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সব স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ সামরিক ঘাঁটি সরাসরি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুর আওতায় চলে আসবে।
বার্তা সংস্থা ইরনার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এই সতর্কবার্তা দেন কমিশনের সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভালো করেই জানে—ভুল সিদ্ধান্ত নিলে এর পরিণতি কী হতে পারে। তাঁর ভাষায়,
“যদি তারা ভুল হিসাব করে, তাহলে ইরানের আচরণ আর ১২ দিনের যুদ্ধের মতো হবে না। এবার যুক্তরাষ্ট্রের সব স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ ঘাঁটি ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তুর অন্তর্ভুক্ত হবে।”
বোরুজেরদি আরও এক ধাপ এগিয়ে স্পষ্ট করে দেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনে যায়, তাহলে ইসরায়েলও এর বাইরে থাকবে না। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো আক্রমণ ইসরায়েলকে সরাসরি সংঘাতের অংশ করে তুলবে এবং তখন ইরানের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলও লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় থাকবে।
ইরানের এই হুঁশিয়ারি শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি এসেছে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি নিয়ে। বোরুজেরদি বলেন, ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরান তার প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেগুলো সংশোধন করা হয়েছে, আধুনিক কৌশল ও প্রযুক্তির মাধ্যমে শক্তিশালী করা হয়েছে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তাঁর দাবি, বর্তমানে ইরানের সামরিক শক্তি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত ও প্রস্তুত।
সাক্ষাৎকারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন বোরুজেরদি—হরমুজ প্রণালী। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভালোভাবেই জানে যে ইরান চাইলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। আর এই প্রণালীর সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও পারস্য উপসাগরের বাণিজ্য গভীরভাবে জড়িত।
“হরমুজ প্রণালীতে আগুন জ্বললে তার আঁচ শুধু একটি দেশে সীমাবদ্ধ থাকবে না—পুরো অঞ্চলই সেই আগুনে পুড়ে যাবে,” বলেন তিনি।
তবে তাঁর ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র এমন ভুল করবে না যাতে পুরো অঞ্চলে এক অনিয়ন্ত্রিত সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। কারণ সেই আগুন শেষ পর্যন্ত সবার জন্যই ধ্বংস ডেকে আনবে।
এ বিষয়ে একই কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়িও ইরনাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কড়া অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামান্যতম ভুল হলেও ইরান সর্বোচ্চ পর্যায়ে জবাব দিতে প্রস্তুত।
রেজায়ির ভাষায়,
“এই প্রশ্নে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ও জনগণের মধ্যে কোনো দ্বিধা বা আপসকামী মনোভাব নেই।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান যুদ্ধকামী নয়। তবে শত্রুপক্ষ যদি শত্রুতামূলক কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ইরান তার জাতীয় স্বার্থ, জনগণ ও দেশের ভূখণ্ড রক্ষায় একচুলও পিছপা হবে না।
রেজায়ি আরও বলেন, ইরান সংঘাত চায় না, কিন্তু দুর্বলতার ভাষাও বোঝে না। শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপের জবাব দেওয়া হবে পরিস্থিতি ও হুমকির মাত্রা অনুযায়ী।
ইরানের অবস্থান স্পষ্ট—শান্তি অগ্রাধিকার, কিন্তু সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নয়।

