বিবিসির বিশ্লেষণ—
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের জন্য এটি ছিল খুব গুরুতর একটি মুহূর্ত। গত বৃহস্পতিবার দেওয়া বক্তব্যে স্টারমার যা কিছু বলেছেন এবং যেমন আচরণ দেখিয়েছেন তাতে বোঝা যায় যে, তিনি এবং তাঁর দল পরিস্থিতির গুরুত্ব পুরোপুরি বুঝতে পারছে।
স্বাভাবিক সময়ে হলে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হয়তো বৃহস্পতিবারের বক্তৃতায় বিভিন্ন এলাকার জন্য উন্নয়নে তহবিল বরাদ্দের বিষয়েই কথা বলতেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার স্টারমার যদি ম্যান্ডেলসনের প্রসঙ্গ এড়িয়ে সেটা করতেন, তাহলে তা খুবই উদ্ভট শোনাত। তিনি নিজেও সেটা বুঝতে পেরেছিলেন।
তাই এদিন তহবিলের বিষয়ে কথা না বলে স্টারমার কথা বলেছেন তাঁর সরকারের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করা সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসন–সংক্রান্ত চলমান বিতর্ক নিয়ে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইনের নথিতে নাম থাকা এবং তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ম্যান্ডেলসন বিতর্কের মধ্যে আছেন।
বৃহস্পতিবার স্টারমার তাঁর বক্তব্যে এপস্টেইনের যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। বলেছেন, তিনি আগে ম্যান্ডেলসনের মিথ্যা কথাকে বিশ্বাস করে তাঁকে যুক্তরাজ্যের শীর্ষ কূটনৈতিক পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
এদিন সাংবাদিকদের একের পর এক প্রশ্নের মুখে পড়েন স্টারমার। একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, লেবার পার্টির পার্লামেন্ট সদস্যরা (এমপি) যে তাঁর প্রতি ‘ক্ষুব্ধ এবং হতাশ’, তা তিনি বুঝতে পারছেন।
লেবার এমপিরাই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্য নির্ধারণ করবেন। তাঁরা এ মুহূর্তে স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে আছেন।
লেবার এমপি র্যাচেল মাসকেল কল্যাণ তহবিল কাটছাঁটের বিষয়ে আগেও কয়েকবার স্টারমারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। এবারও তিনি স্টারমারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, তাঁর মনে হয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্টারমারের অবস্থান টেকসই নয় এবং অবশ্যই তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে।
মাসকেলের দাবি, পিটার ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে যে জেফরি এপস্টেইনের সম্পর্ক ছিল, সে কথাটি তাঁকে (ম্যান্ডেলসন) নিয়োগ দেওয়ার সময়ই স্টারমার জানতেন। অথচ এটা জানার পরও তিনি ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দিয়েছেন।

মাসকেল আরও বলেছেন, এটি এমপিদের প্রতি এবং এপস্টেইনের নিপীড়নের শিকার হওয়া মানুষদের প্রতি ‘অসম্মানজনক আচরণ’।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক লেবার এমপি বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভে ম্যাট চোর্লিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমাকে বলতেই হচ্ছে, তিনি কীভাবে দায়িত্ব চালিয়ে যাবেন, তা আমি বুঝতে পারছি না।’
লেবার পার্টির এক মন্ত্রী বলেন, ‘একমাত্র নিশ্চিত বিষয় হলো, সরকার এখন পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই এটি যেকোনো দিকে যেতে পারে।’
তবে ম্যাট চোর্লি যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের কেউ কেউ আবার প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন দিয়েছেন। রাগবির এমপি জন স্লিংগার বলেছেন, ‘ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী এখানে সঠিক কাজ করেছেন।’
লেবার পার্টির রাজনীতিবিদ স্টিভ উইদারডেন বিবিসি ওয়েলসকে বলেন, ‘অন্ততপক্ষে প্রধানমন্ত্রীর চিফ অব স্টাফ ম্যাকসুইনিকে অবশ্যই জবাব দিতে হবে, এপস্টেইনের সঙ্গে ম্যান্ডেলসনের সম্পর্কের কথা জানা থাকার পরও কেন তিনি তাঁকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছিলেন।’
তবে উল্লেখজনক বিষয় হলো, আড়ালে অনেকে ক্ষোভ দেখালেও খুব কম সংখ্যক এমপি প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন।
যে অল্প কয়েকজন এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে এ নিয়ে কথা বলেছেন, তাঁরা মূলত এমন এমপি, যাঁরা শুরু থেকেই তাঁর নেতৃত্বকে খুব একটা সমর্থন করেননি।
প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর চিফ অব স্টাফ ম্যাকসুইনিকে বরখাস্ত করার দাবি তোলা এমপিদের সংখ্যাটাও খুব বেশি নয়। কিয়ার স্টারমার এখন পর্যন্ত ম্যাকসুইনিকে বরখাস্ত করতে রাজি হননি।
এতে বোঝা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী আগের চেয়ে দুর্বল হলেও তাঁর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো চ্যালেঞ্জ আসার আশঙ্কা খুব বেশি নেই।
এক এমপি বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে গর্টন এলাকায় উপনির্বাচনের আগে কিছু ঘটবে বলে আমার মনে হয় না।’ ২৬ ফেব্রুয়ারি গর্টনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
একজন সাবেক মন্ত্রী বলেন, ‘আমার এখনো মনে হচ্ছে, মে মাসের আগে কেউ কোনো পদক্ষেপ নেবে না। তবে পরিস্থিতি খুব দ্রুত বদলাচ্ছে।’
সাবেক এই মন্ত্রী আরো বলেন, ‘ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দেওয়ার মতো এমন গুরুতর ভুল সিদ্ধান্ত থেকে প্রধানমন্ত্রী কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবেন, তা আমি বুঝতে পারছি না।’
একজন বর্তমান মন্ত্রী বলেন, ‘তাঁর সময় শেষ। কখন তা বাস্তবায়িত হবে, সেটাই এখন প্রশ্ন।’

