পাকিস্তানের আয়তনে সবচেয়ে বড় কিন্তু জনবিরল প্রদেশ বেলুচিস্তানের সুলাইমান ও কিরথার পর্বতমালায় আবারও প্রাণঘাতী সংঘাতের ধুলো উড়ছে। দীর্ঘদিনের উপেক্ষিত ক্ষোভ, সহিংস বিদ্রোহ, ছায়াযুদ্ধ এবং জটিল ভূ-রাজনীতির সংমিশ্রণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় এই প্রদেশ নতুন করে অস্থির হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি বেলুচিস্তানের এক ডজনের বেশি স্থানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমন্বিত হামলায় টানা প্রায় ৪০ ঘণ্টা তীব্র লড়াই চলে। পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তারা এসব হামলাকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ‘বেপরোয়া’ ও ‘চূড়ান্ত মরিয়া প্রচেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কয়েক দশক ধরে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে আসা নিষিদ্ধ সংগঠন বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) হামলার দায় স্বীকার করেছে।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব সংঘর্ষে প্রায় ২০০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩১ জন বেসামরিক নাগরিক, ১৭ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ১৪৫ জন বিএলএ যোদ্ধা। শুধু একদিনেই শতাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অন্যতম বড় ও দুঃসাহসিক হামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও নিরাপত্তা বাহিনীর ৮৪ সদস্য নিহত হওয়ার বিএলএর দাবি সরকার প্রত্যাখ্যান করেছে।
প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটার পুলিশ একাডেমি, আদালত ও বাজার এলাকাজুড়ে সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাসের ক্ষত আজও দৃশ্যমান। তবুও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ থাকার দাবি করা হচ্ছে।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। তাঁর ভাষায়, বিএলএর এই হামলা ‘কোণঠাসা শত্রুর শেষ নিশ্বাস’। তবে বাস্তব চিত্র সরকারি বয়ানকে অনেকাংশে ম্লান করে দিচ্ছে। নিহতদের মধ্যে এক ডজনের বেশি নিরাপত্তাকর্মী এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বেসামরিক মানুষের মৃত্যু পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরছে।

বিদেশি ষড়যন্ত্রের বয়ান
বিচ্ছিন্নতাবাদী হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসলামাবাদের অবস্থান অনেকটাই চেনা। পাকিস্তান সরকার এসব সহিংসতাকে ‘ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান’ বা ভারতের উসকানির ফল বলে দাবি করছে। নয়াদিল্লি বরাবরের মতো এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা ভাষ্যে ‘বিদেশি হাত’ তত্ত্ব একটি কেন্দ্রীয় জায়গা দখল করে আছে।
২০১৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ভারতীয় নাগরিক কুলভূষণ যাদবের ঘটনা বেলুচিস্তান ইস্যুতে পাকিস্তানের এই অবস্থানকে আরও জোরালো করে। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যাদবের স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও প্রকাশ করে ইসলামাবাদ দাবি করে, বেলুচিস্তানের সংঘাতে বিদেশি হস্তক্ষেপ রয়েছে। তবে সমালোচকেরা বলছেন, এই বয়ান স্থানীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষকে আড়াল করার একটি কৌশল হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
ক্ষোভই বিদ্রোহের জ্বালানি
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। কোয়েটার চা–দোকান কিংবা গ্রামাঞ্চলের আড্ডায় উঠে আসে বঞ্চনা ও বৈষম্যের গল্প। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ বেলুচিস্তানে দারিদ্র্য কেন স্থায়ী, তা নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন দীর্ঘদিনের।
৪৬ বিলিয়ন ডলারের চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিসি) প্রকল্প গোয়াদর বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও স্থানীয় মানুষের বড় অংশ এটিকে নিজেদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখেন না। তাঁদের আশঙ্কা, প্রকল্পের সুফল বেইজিং ও ইসলামাবাদে সীমাবদ্ধ থাকবে, বেলুচ জেলে বা মেষপালকদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আসবে না। এই হতাশাই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের শক্তির উৎস হয়ে উঠেছে।
আল-জাজিরাকে দেওয়া এক নিরাপত্তা কর্মকর্তার মন্তব্যে উঠে এসেছে চরম অনিশ্চয়তার চিত্র। তাঁর ভাষায়, বিদ্রোহীরা শত শত সংখ্যায় এসে চেকপোস্ট দখল করে নেয়, ফলে কোনো এলাকা সত্যিকারের নিরাপদ বলা যায় না।

সংঘাতের মানবিক মূল্য
বেলুচিস্তান যেন বৈপরীত্যে ভরা এক প্রদেশ। একদিকে আধুনিক গোয়াদর বন্দর, অন্যদিকে দুর্গম উপত্যকা; যেখানে সামান্য অস্থিরতায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘ ও উন্মুক্ত সীমান্ত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কৌশলগত সুবিধা দেয়, যা পাকিস্তানের জন্য দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
২০১৩ সালের হাজারা টাউন হামলা কিংবা ২০১৬ সালের কোয়েটা পুলিশ একাডেমির রক্তক্ষয়ী ঘটনার স্মৃতি আজও মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এসব ঘটনা নিরাপত্তা ব্যর্থতা ও দুর্বল সামাজিক চুক্তিরই প্রতিফলন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আল-জাজিরাকে বলেন, বেলুচিস্তানের প্রায় সব খাতেই দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এর ফলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ সম্ভব হচ্ছে না, আর নিরাপত্তা সাধারণ মানুষের কাছে এক ধরনের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।
সমাধানের পথ কোথায়?
সাম্প্রতিক সেনা অভিযানে পাকিস্তানের সামরিক শক্তির প্রদর্শন ঘটলেও সহিংসতা থামছে না। প্রতিবারই ‘ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান’ নতুন করে আলোচনায় আসে, অস্ত্র সমর্পণের অনুষ্ঠান হয়, কিন্তু বিদ্রোহ আবার ফিরে আসে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বেলুচিস্তানে টেকসই স্থিতিশীলতার জন্য কেবল নিহতের সংখ্যা গোনা যথেষ্ট নয়। প্রকৃত অসন্তোষকে স্বীকার করে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, রাজনৈতিক সংলাপ এবং কার্যকর আঞ্চলিক কূটনীতি জরুরি। নইলে সংঘাতের ধুলো সাময়িকভাবে থিতালেও, তা আবারও নতুন ঝড়ের পূর্বাভাস হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: ‘আল-জাজিরা’র ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

