জেফরি এপস্টাইন ২০১৯ সালে মারা গেছেন। তবে তাকে ঘিরে থাকা বিতর্ক ও কেলেঙ্কারি থামেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন তথ্য সামনে আসছে। এসব তথ্য তাকে যৌন অপরাধ, অর্থ ও ক্ষমতার এক ভয়ংকর নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে তুলে ধরছে। এই নেটওয়ার্কে যুক্ত ছিলেন বিশ্বের বহু ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস বা ডিওজে প্রায় ৩০ লাখ নথি প্রকাশ করে। এসব নথিতে দেখা যায়, যৌন অপরাধের পাশাপাশি এপস্টাইনের মাথায় ছিল মানবজাতিকে ‘উন্নত’ করার বিকৃত এক ধারণা। তিনি জিনতত্ত্ব ও জেনেটিক্স নিয়ে গভীরভাবে আচ্ছন্ন ছিলেন।
প্রকাশিত নথিতে বর্ণবাদী ও লিঙ্গবৈষম্যমূলক কথোপকথনের স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। এপস্টাইন নিজেকে ট্রান্সহিউম্যানিজমের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরতেন। এটি এমন একটি দর্শন, যেখানে ইউজেনিক্স বা উন্নত প্রজনন ধারণার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিন্তা যুক্ত করা হয়। নথি অনুযায়ী, জিন সম্পাদনা নিয়ে কাজ করা একটি কোম্পানিতে অর্থায়নের পরিকল্পনাও করেছিলেন তিনি। নির্দিষ্ট কিছু জাতিগত বৈশিষ্ট্যের প্রতি তার আলাদা ঝোঁক ছিল। বিশেষ করে নীল চোখকে তিনি গুরুত্ব দিতেন।
জাতি ও বর্ণ নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সবচেয়ে আপত্তিকর। ২০০৮ সালে প্রথমবার দোষী সাব্যস্ত হওয়া এপস্টাইন বিশ্বাস করতেন, জিনগত কারণেই কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় কম বুদ্ধিমান। ২০১৬ সালে ভাষাবিদ ও সমাজকর্মী নোয়াম চমস্কিকে পাঠানো এক ইমেইলে তিনি লেখেন, আফ্রিকান আমেরিকানদের পরীক্ষার স্কোর কম হওয়ার বিষয়টি নাকি প্রমাণিত। পরিস্থিতি বদলাতে হলে ‘অস্বস্তিকর সত্য’ মেনে নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

জার্মান কগনিটিভ বিজ্ঞানী জোশা বাখের সঙ্গে ইমেইল আদান–প্রদানে আরও ভয়ংকর ধারণার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বাখ তখন এমআইটিতে কর্মরত ছিলেন। এপস্টাইনের কাছ থেকে তিনি ৩ লাখ পাউন্ড অনুদান পেয়েছিলেন। ইমেইলগুলোতে দেখা যায়, কৃষ্ণাঙ্গদের জিন পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের আরও বুদ্ধিমান করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে এপস্টাইনের আগ্রহ ছিল।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে বাখ এক ইমেইলে লেখেন, কৃষ্ণাঙ্গদের শারীরিক বিকাশের সময় পরিবর্তন করলে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বাড়তে পারে। এই আলোচনায় কিছু উদ্ভট ও বিতর্কিত বৈজ্ঞানিক যুক্তি উঠে আসে। বাখ দাবি করেন, কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের শারীরিক দক্ষতা দ্রুত বাড়ে, ফলে মানসিক বিকাশ নাকি বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি আরও বলেন, আফ্রিকানরা মূলত শিকার বা দৌড়ঝাঁপের জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে, আর ইউরোপীয়রা কৃষিকাজের জন্য অভিযোজিত।
এপস্টাইন এসব যুক্তিতে সম্মতি জানান। এরপর তিনি লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য করতে থাকেন। এক পর্যায়ে বাখ বয়স্ক ও দুর্বল মানুষের ব্যাপক মৃত্যু মানবজাতির জন্য উপকারী হতে পারে বলেও লেখেন। তিনি বলেন, মানুষ বেশি হয়ে গেছে, তাই সমাজের উচিত অব্যবহৃত অংশ বাদ দেওয়া। এপস্টাইন এসব কথার বিরোধিতা করেননি।
পরে অবশ্য বাখ তার অবস্থান বদলান। নভেম্বরে বোস্টন গ্লোবকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জাতিগত পরিচয় মানসিক পার্থক্যের কারণ নয়। পরবর্তী গবেষণায় তিনি বুঝেছেন, জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।

বিজ্ঞানের জগতে এপস্টাইনের প্রবেশ ঘটে জন ব্রকম্যানের মাধ্যমে। ব্রকম্যান ছিলেন জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখকদের একজন প্রভাবশালী এজেন্ট। ২০০৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় এক নৈশভোজে তাদের পরিচয় হয়। এরপর এপস্টাইন বিভিন্ন বিজ্ঞানীকে অর্থায়ন শুরু করেন এবং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। নিজের ওয়েবসাইটে তিনি দাবি করতেন, বহু খ্যাতনামা বিজ্ঞানীকে স্পনসর করার সুযোগ তার হয়েছে।
২০০৬ সালে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের সেন্ট থমাসে এপস্টাইন একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেখানে বক্তা ছিলেন স্টিফেন হকিং। সম্মেলনের বিষয় ছিল মহাকর্ষ তত্ত্ব। তবে অংশগ্রহণকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এপস্টাইনের আগ্রহ ছিল মানব জিনোম নিখুঁত করা এবং বংশগতভাবে ‘উন্নত’ মানুষ তৈরি করা।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রাম ফর ইভোলিউশনারি ডাইনামিক্সে তিনি ৬৫ লাখ ডলার অনুদান দেন। ২০১১ সালে ওয়ার্ল্ডওয়াইড ট্রান্সহিউম্যানিস্ট অ্যাসোসিয়েশনকে দেন ২০ হাজার ডলার।
নথিপত্রে এপস্টাইনকে জিনগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণায় মগ্ন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখা যায়। একজন ইহুদি হয়েও তিনি হলোকাস্ট নিয়ে ঠাট্টা করতেন এবং আর্য বৈশিষ্ট্যের প্রতি আগ্রহ দেখাতেন।
ইমেইলে তিনি বারবার নীল চোখের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন। তার বিশ্বাস ছিল, নীল চোখ বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ। যৌন কাজে আনা নারীদের মধ্যেও তিনি নীল চোখের প্রতি বিশেষ নজর দিতেন। এমনকি একটি নথিতে বিজ্ঞান সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীদের নামের পাশে চোখের রং লেখা ছিল।
বিনিয়োগকারী হিসেবেও তিনি ডিজাইনার বেবি ও জিনগতভাবে তৈরি শিশুদের ধারণায় আগ্রহী ছিলেন। ডিওজে প্রকাশিত এক নথিতে দেখা যায়, তিনি অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের সঙ্গে ক্লোনিং নিয়ে কথোপকথনের কথা স্মরণ করেন। সেখানে তিনি বলেন, ক্লোনিং শুরু করতে চান। এ সময় প্রিন্স অ্যান্ড্রু নৈতিক প্রশ্ন তুললে এপস্টাইন মাথা ছাড়া দেহ তৈরির কথাও বলেন।
২০১৮ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোক্তা ব্রায়ান বিশপের সঙ্গে ইমেইলে তিনি ডিজাইনার বেবি প্রকল্পে অর্থায়নের আলোচনা করেন। সেখানে তিনি লেখেন, বিনিয়োগে সমস্যা নেই, সমস্যা হলো নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ধরা পড়ে যাওয়া।
তখন নাবালিকাকে দিয়ে পতিতাবৃত্তির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে এপস্টাইনের দশ বছর পার হয়ে গেছে। এর পরের বছর তার বিরুদ্ধে যৌন পাচারের অভিযোগ আনা হয়। এক মাস পর তিনি আত্মহত্যা করেন।
বিশপ প্রকল্পে গোপনীয়তা বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন। তিনি বলেন, শিশুদের পরিচয় গোপন রাখতে হবে। না হলে মিডিয়া তাদের আজীবন অদ্ভুত মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করবে। তিনি জানান, পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথম জীবন্ত জন্ম এবং সম্ভবত মানব ক্লোন তৈরির লক্ষ্য ছিল তার।
তবে টেলিগ্রাফকে দেওয়া বক্তব্যে বিশপ দাবি করেন, তারা কখনো এপস্টাইনের কাছ থেকে টাকা নেননি।
এর আগে খবর বেরিয়েছিল, নিউ মেক্সিকোতে এপস্টাইনের সাত হাজার একরের খামারে তিনি নিজের ডিএনএ ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ২০১৯ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, ২০০০-এর দশকের শুরুতে ওই খামারকে একটি প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল তার। সেখানে নারীদের তার শুক্রাণু দিয়ে গর্ভবতী করার কথা ভাবা হয়।
কম্পিউটার বিজ্ঞানী জারন ল্যানিয়ার জানান, একটি স্পার্ম ব্যাংকের ধারণা থেকেই এপস্টাইনের এই পরিকল্পনা আসে। তিনি একসঙ্গে ২০ জন নারীকে গর্ভবতী করতে চেয়েছিলেন। এজন্য বিলাসবহুল ডিনার পার্টিতে সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী নারীদের বাছাই করা হতো।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, এপস্টাইন ক্রায়োনিক্স অর্থাৎ মৃতদেহ হিমায়িত করে ভবিষ্যতে জীবিত করার ধারণাতেও আগ্রহী ছিলেন। নিজের মাথা ও যৌনাঙ্গ সংরক্ষণের ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
জোড়ো খামারে প্রজনন কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন পর্যন্ত গড়িয়েছিল কি না, তার প্রমাণ নেই। তবে প্রকাশিত নথিপত্র স্পষ্ট করে, এপস্টাইন শুধু একজন যৌন অপরাধীই ছিলেন না। জাতি, লিঙ্গ ও জিনগত শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে তার বিকৃত চিন্তাভাবনা তাকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছিল। মানবজাতিকে উন্নত করার নামে তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন মানব ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়।

