ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা—যেখানে প্রতিদিনের জীবন এখন যুদ্ধের বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার নাম। কয়েক বছর ধরে চলা ইসরাইলি আগ্রাসনে শুধু ঘরবাড়ি বা হাসপাতালই নয়, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজার পুরো পরিবহন ব্যবস্থা। এই ক্ষতির আর্থিক মূল্য প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ২৫০ কোটি ডলার—এমন তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় শনিবার, ০৭ জানুয়ারি।
কিন্তু সংখ্যার এই বিশাল অঙ্কের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামের গল্প—যার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান এল-নাবিহ।
প্রতিদিন সকাল হলেই অধ্যাপক এল-নাবিহ বেরিয়ে পড়েন একটি নির্ভরযোগ্য জায়গার খোঁজে—যেখানে বিদ্যুৎ আছে, ইন্টারনেট সংযোগ আছে। তার সাইকেলের পেছনে বাঁধা থাকে ব্রিফকেস আর ল্যাপটপ। উদ্দেশ্য একটাই—অনলাইনে তার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা।
যুদ্ধের আগে গাজায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সাইকেল চালানো ছিল বিরল দৃশ্য। তখন রাস্তায় চলত বাস, প্রাইভেট কার, ট্যাক্সি। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য পাল্টে গেছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত সড়ক, অকেজো গণপরিবহন আর জ্বালানির চরম সংকট গাজার মানুষকে ঠেলে দিয়েছে এক নতুন বাস্তবতায়—সাইকেল এখন বিলাস নয়, প্রয়োজন।
এই বাস্তবতায় ধনী-গরিবের বিভাজনও অনেকটাই মুছে গেছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক—সবাই এখন একই কাতারে।
অধ্যাপক এল-নাবিহের ব্যক্তিগত গল্প এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। তিনি জানান, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজা শহরের শুজাইয়া এলাকায় পার্কিং করা অবস্থায় তার গাড়িটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সেদিন তিনি আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই কাছাকাছি একটি ভবনে ইসরাইলি বিমান হামলা চালানো হয়। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে তার গাড়ির দুই পাশের উইন্ডোস্ক্রিন ভেঙে পড়ে, ইঞ্জিন সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়।
“গাড়িটি এখন পুরোপুরি অচল,” বলেন তিনি।
“তার ওপর জ্বালানি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই আমাকে নতুনভাবে মানিয়ে নিতে হয়েছে।”
এই মানিয়ে নেওয়াই আজ গাজার মানুষের নিয়তি।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলি হামলায় গাজার সড়ক, সেতু, বাস টার্মিনাল ও পরিবহন নেটওয়ার্ক ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু এলাকায় যানবাহন চলাচল প্রায় অসম্ভব। যেসব গাড়ি এখনও আছে, সেগুলো চালানোর মতো জ্বালানি নেই।
ফলে সাইকেল, হাতে ঠেলা গাড়ি কিংবা পায়ে হাঁটাই হয়ে উঠেছে মানুষের একমাত্র ভরসা। কিন্তু এটি শুধু যাতায়াতের সংকট নয়—এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, কাজ ও সামাজিক জীবনের ওপর সরাসরি আঘাত।
একটি আধুনিক শহর ধীরে ধীরে যেন পিছিয়ে যাচ্ছে কয়েক দশক।
গাজার পরিবহন ব্যবস্থার এই ২৫০ কোটি ডলারের ক্ষতি আসলে কাগজে-কলমের হিসাব মাত্র। বাস্তবে এর মূল্য আরও গভীর—হারিয়ে যাওয়া সময়, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষা, পৌঁছাতে না পারা হাসপাতাল, থেমে যাওয়া স্বাভাবিক জীবন।
অধ্যাপক এল-নাবিহের সাইকেল তাই শুধু একটি বাহন নয়।
এটি গাজার মানুষের সহনশীলতা, জেদ আর টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক।

