দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে আলোচনার টেবিলে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গত শুক্রবার ওমানের রাজধানী মাস্কাটে দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তবে এই সংলাপ কোনো স্বাভাবিক কূটনৈতিক পরিবেশে হয়নি। আলোচনার আগেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজের বিশাল বহর পাঠিয়ে স্পষ্ট শক্তি প্রদর্শন করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এই সামরিক চাপের মধ্যেই ইরানকে আলোচনায় বসতে রাজি করাতে সক্ষম হন ট্রাম্প। কিন্তু আলোচনার দরজা খুললেও সেখানে স্বস্তির বদলে অপেক্ষা করছে কঠিন শর্ত। ইরানের সামনে যুক্তরাষ্ট্র যে দাবিগুলো তুলে ধরেছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা শুধু কঠিন নয়—অনেকের মতে প্রায় অসম্ভব।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম মারিভ–এর খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইরানের কাছে মোট পাঁচটি প্রধান শর্ত তুলে ধরেছে। এসব শর্ত ইরানের সামরিক, কৌশলগত ও আঞ্চলিক প্রভাবের মূল স্তম্ভগুলোকেই লক্ষ্য করে দেওয়া হয়েছে।
প্রথম শর্ত অনুযায়ী, ইরানকে তাদের সমৃদ্ধকৃত ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে।
দ্বিতীয় শর্তে বলা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে হবে—যা কার্যত দেশটির বহু বছরের পারমাণবিক কর্মসূচির অবসান ঘটানোর শামিল।
তৃতীয় ও চতুর্থ শর্ত আরও স্পর্শকাতর। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করতে চায় এবং একই সঙ্গে মিসাইল কর্মসূচি ও উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই দাবিই ইরানের নিরাপত্তা দর্শনের মেরুদণ্ডে আঘাত করে।
পঞ্চম শর্তে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে নির্দেশ দিয়েছে—সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক ও লেবাননে থাকা তাদের সশস্ত্র মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সব ধরনের সহায়তা বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের দীর্ঘদিনের প্রভাব বলয় গুঁড়িয়ে দেওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চাথাম হাউজের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী ব্রোনওয়েন ম্যাডোক্স মনে করেন, ট্রাম্পের দাবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ইরানের জন্য সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য শর্ত হলো ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি।
তিনি বলেন, “এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোই ইরানের একমাত্র কার্যকর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এগুলো ছাড়া ইরান কার্যত নগ্ন হয়ে পড়বে। তখন ইসরায়েলের আকাশ শক্তি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের স্টিলথ বোম্বারের সামনে দেশটি সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত হয়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো ইরানি সরকার টিকে থাকতে পারবে না।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই পাঁচটি শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন ইরান সেগুলো প্রত্যাখ্যান করতেই বাধ্য হয়। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রত্যাখ্যানের অর্থ শুধু আলোচনা ব্যর্থ হওয়া নয়—বরং সামরিক সংঘাতের পথ আরও পরিষ্কার হয়ে যাওয়া।
এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনে করছেন, ইরানের সামনে এখন দুটি পথ—একটি হলো জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান বিসর্জন দিয়ে শর্ত মানা, আর অন্যটি হলো শর্ত প্রত্যাখ্যান করে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার ঝুঁকি নেওয়া। মাস্কাটের আলোচনা তাই শুধু কূটনৈতিক বৈঠক নয়, বরং সম্ভাব্য যুদ্ধ ও শান্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণ।

