দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডে আজ রোববার গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জান্তা সরকার প্রণীত বর্তমান সংবিধান বহাল থাকবে নাকি নতুন সংবিধান রচিত হবে—এই প্রশ্নে ভোটাররা নিজেদের মতামত দিচ্ছেন। একই দিনে দেশটিতে সাধারণ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বাংলাদেশেও চার দিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে গণভোট হওয়ার কথা রয়েছে।
থাইল্যান্ডে সর্বশেষ ২০১৪ সালে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর পাঁচ বছর জান্তা শাসন চলে। ওই সময়েই বর্তমান সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। সমালোচকদের মতে, এই সংবিধানে এমন সব প্রতিষ্ঠানকে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর নিয়োগ ও প্রভাব পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটের মাধ্যমে কার্যকর হয়।
২০১৯ সালে জান্তা সরকারের অবসানের পর দেশটিতে কোনো সরকারই পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। ২০২৩ সালে সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর গত দুই বছরে থাইল্যান্ড তিনজন প্রধানমন্ত্রী দেখেছে।
সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল গত ডিসেম্বরে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচন ঘোষণা করেন। ৮ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। একই দিনে সংবিধান প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, একই দিনে ভোট আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো খরচ কমানো এবং ভোটারদের জন্য ভোটদান প্রক্রিয়া সহজ করা।
আজ ভোটাররা তিনটি ব্যালট পেপারে ভোট দিচ্ছেন। সবুজ রঙের ব্যালটে নিজ নিজ আসনের পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচন করা হচ্ছে। গোলাপি রঙের ব্যালটে পার্টি লিস্ট প্রতিনিধির জন্য ভোট দেওয়া হচ্ছে। হলুদ রঙের ব্যালট পেপারে ভোটাররা সংবিধান প্রশ্নে গণভোটে অংশ নিচ্ছেন।
নতুন সংবিধানের দাবি কেন
থাইল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরেই বর্তমান সংবিধান নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। ২০১৭ সালে সর্বশেষ সেনা অভ্যুত্থানের পর জান্তা সরকারের অধীনে এই সংবিধান প্রণীত হয়। সমালোচকদের দাবি, সংবিধানটি গণতান্ত্রিক চরিত্র ক্ষুণ্ন করেছে।
তাঁদের মতে, এই সংবিধানে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা দুর্বল করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন শাখার মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া এটি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো পার্লামেন্টের মাধ্যমে রচিত হয়নি। সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও ছিল সীমিত।
সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেট। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, সিনেটকে অত্যধিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হতে সিনেটের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। সিনেট সদস্যরাও এমন একটি প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হন, যেখানে সাধারণ জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ খুবই সীমিত।
এ ছাড়া সিনেটের হাতে সাংবিধানিক আদালতের বিচারক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বিভিন্ন স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের সদস্য মনোনয়নের ক্ষমতা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রায়ই রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক দল ভেঙে দেওয়া বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অযোগ্য ঘোষণার ঘটনাও এর সঙ্গে যুক্ত বলে সমালোচকেরা মনে করেন।
গণভোটের উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া
বর্তমান সংবিধানের অধীনে পার্লামেন্টের নতুন সংবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা থাকলেও তার আগে নাগরিকদের অনুমোদন প্রয়োজন। এই গণভোটের মাধ্যমে ভোটাররা নির্ধারণ করবেন, নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা উচিত কি না।
গণভোটে একটি প্রশ্নই রাখা হয়েছে—‘আপনি কি নতুন সংবিধান প্রণয়নের অনুমোদন দেন?’ ভোটাররা তিনটি বিকল্পের মধ্যে একটি বেছে নিতে পারছেন—‘হ্যাঁ’, ‘না’ অথবা ‘মতামত নেই’।
যদি ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ‘হ্যাঁ’ বলেন, তাহলে পার্লামেন্ট নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু করার অনুমতি পাবে। আর যদি ‘না’ জয়ী হয়, তাহলে পরবর্তী গণভোটে অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত নতুন সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া যাবে না।
বর্তমানে পার্লামেন্ট সংবিধানের কিছু ধারা সংশোধনের ক্ষমতা রাখে। তবে সংবিধান দ্বারা বিশেষভাবে সংরক্ষিত কিছু ধারা রয়েছে, যেগুলো এই ক্ষমতার আওতায় সংশোধন করা সম্ভব নয়। এর মধ্যে রাষ্ট্র ও রাজতন্ত্র–সম্পর্কিত ধারা ১ ও ২ উল্লেখযোগ্য। সমালোচকদের মতে, এ কারণে বর্তমান ব্যবস্থায় কার্যকর সংবিধান সংশোধন অত্যন্ত কঠিন।
ডাকযোগে ভোট নয়
ব্যাংকক পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ডের নির্বাচন কমিশন ডাকযোগে গণভোটের অনুমতি দেয়নি। কমিশনের মতে, ডাকযোগে ভোটে সরাসরি ও গোপন ভোটের শর্ত পূরণ নাও হতে পারে। ভোটারদের ওপর প্রভাব বা চাপ প্রয়োগের ঝুঁকি রয়েছে। অন্যের হয়ে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এ ছাড়া সময়মতো ব্যালট পেপার পৌঁছানো এবং ভোট শেষে তা নির্ধারিত ঠিকানায় ফেরত আসা নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে। ভোটারের পরিচয় যাচাই করাও কঠিন হবে বলে কমিশন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
সংবিধান সংশোধনের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান
থাইল্যান্ডের জরিপ সংস্থা কেপিআইয়ের এক জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৫৩ শতাংশ মানুষ নতুন সংবিধান প্রণয়নের পক্ষে। জেন–জি নামে পরিচিত তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সমর্থনের হার প্রায় ৫৯ শতাংশ।
পিপলস পার্টি বা মুভ ফরওয়ার্ড পার্টি এবং ফিউ থাই পার্টিসহ দেশটির অধিকাংশ প্রধান রাজনৈতিক দল সংবিধান সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দল ভুমজাইথাই পার্টিও এই উদ্যোগকে সমর্থন করছে। তবে তারা জোর দিয়ে বলেছে, রাজতন্ত্র–সম্পর্কিত কোনো ধারা যেন পরিবর্তিত না হয়। ডেমোক্র্যাট পার্টিও একই অবস্থান নিয়েছে।
অন্যদিকে ইউনাইটেড থাই নেশন পার্টির মতো অতি রক্ষণশীল দলগুলো সংবিধান সংশোধনের বিপক্ষে রয়েছে।
এরপর কী হবে?
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেই নতুন সংবিধান রচিত হবে—বিষয়টি এমন নয়। এই গণভোটকে দীর্ঘ সংবিধান প্রণয়ন বা সংশোধন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৫ সালে থাইল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালতের এক রায়ে বলা হয়, সম্পূর্ণ নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হলে তিন দফা গণভোট প্রয়োজন হবে। প্রথম গণভোটে জনগণের মতামত নেওয়া হবে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা উচিত কি না। দ্বিতীয় গণভোটে খসড়া সংবিধানের প্রণয়ন পদ্ধতি ও মূল বিষয়বস্তু অনুমোদনের প্রশ্নে ভোট হবে। তৃতীয় গণভোটে ভোটাররা নতুন সংবিধান চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত দেবেন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। এর আগে থাইল্যান্ডে দুবার সংবিধান নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০০৭ সালের ১৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত প্রথম গণভোটে প্রায় ৫৮ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ বলেন। ২০১৬ সালের ৭ আগস্ট দ্বিতীয় গণভোটে ৬১ শতাংশের বেশি ভোটার নতুন সংবিধান প্রণয়নের পক্ষে মত দেন। এরপরই বর্তমান সংবিধান কার্যকর হয়। তবে শুরু থেকেই এই সংবিধান গণতন্ত্র ও জনগণের মতামত সুরক্ষার প্রশ্নে বিতর্কের মুখে পড়ে।
থাইল্যান্ডে আজ সংবিধান সংশোধন ও সাধারণ নির্বাচনের জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে ভোটাররা নতুন সংবিধান প্রণয়নের পক্ষে-নেপক্ষে মত প্রকাশ করছেন। বর্তমান সংবিধানকে সমালোচিত করা হচ্ছে জনগণের ক্ষমতা দুর্বল এবং সিনেটকে অতিরিক্ত শক্তি দেওয়ার জন্য। গণভোটের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়া, যা সম্পূর্ণ শেষ হতে দুই বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে। সূত্র: প্রথম আলো

