যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তির বিরোধিতায় দেশজুড়ে আন্দোলনে নামছে ভারতের কৃষকসমাজ। ২০২১ সালে বিতর্কিত তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারে নরেন্দ্র মোদি সরকারকে বাধ্য করা কৃষকনেতা ও তাঁদের সংগঠনগুলো এবারও দেশব্যাপী কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে।
চুক্তির বিরোধিতায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে কৃষক সংগঠনগুলো। সংযুক্ত কিষান মোর্চা (এসকেএম), অল ইন্ডিয়া কিষান সভা, ভারতীয় কিষান ইউনিয়ন, ক্রান্তিকারী কিষান ইউনিয়ন (পাঞ্জাব)সহ বিভিন্ন রাজ্যের কৃষক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ভারত সরকার পুরোপুরি সমর্পণ করেছে। মার্কিন বহুজাতিক সংস্থার স্বার্থ রক্ষায় দেশের কৃষি ও কৃষকদের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কৃষক সংগঠনগুলো কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের পদত্যাগ দাবি করেছে। তাঁদের অভিযোগ, বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে গোয়েল ও সরকার দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করছেন এবং ভুল তথ্য দিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তি ঘোষণা করার পর বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল দাবি করেন, চুক্তিতে ভারতের কৃষি ও দুগ্ধজাত খাতের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা হয়েছে এবং এই দুটি খাত চুক্তির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। তবে সংযুক্ত কিষান মোর্চা এক বিবৃতিতে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ও প্রচার সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং দেশদ্রোহের শামিল। সংগঠনটির মতে, অবিলম্বে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত।
এসকেএম আরও বলেছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উচিত পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যচুক্তিতে সই না করা। অন্যথায় তাঁকে সারা দেশের কৃষকসমাজের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে।
এসকেএম (অরাজনৈতিক) সংগঠনের নেতা জগজিৎ সিং ডাল্লেওয়াল এক বিবৃতিতে বলেন, বাণিজ্যমন্ত্রী দাবি করলেও বাস্তবে কৃষি ও দুগ্ধজাত খাত সুরক্ষিত নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মার্কিন কৃষিজাত ও খাদ্যপণ্যের ওপর থাকা বিভিন্ন অশুল্ক বাধা আলোচনার মাধ্যমে দূর করতে ভারত সম্মত হয়েছে।
ডাল্লেওয়ালের মতে, এই অবস্থান বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। যৌথ বিবৃতি থেকেই পরিষ্কার, মার্কিন চাপের মুখে কৃষিজাত পণ্যের জন্য ভারতের বাজার উন্মুক্ত করতে সরকার রাজি হয়েছে। এর মাশুল দিতে হবে দেশের কৃষকদের।
অল ইন্ডিয়া কিষান সভার নেতা কৃষ্ণ প্রসাদ বলেন, লাল জোয়ার, সয়াবিন তেল ও পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত পণ্যের আমদানিতে সম্মতি দেওয়ার ফলে কৃষি খাতের পাশাপাশি দুগ্ধজাত খাতেও বিরূপ প্রভাব পড়বে।
কৃষক নেতাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এই ধরনের বাণিজ্যচুক্তি মূলত ওই দেশগুলোর স্থবির অর্থনীতিকে সুবিধা দেবে এবং বিপন্ন করবে ভারতের কৃষিসমাজকে।
ভারতীয় কিষান ইউনিয়নের নেতা রাকেশ টিকায়েত ও ক্রান্তিকারী কিষান ইউনিয়নের নেতা দর্শন পাল বলেন, কৃষকেরা এই চুক্তি নিয়ে গভীরভাবে শঙ্কিত এবং নানা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘট সফল করার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কুশপুতুল পোড়ানো হবে।
কৃষক সংগঠনের নেতারা জম্মু ও কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ এবং উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর ফলচাষিদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, আপেল, আনারাস, নারকেল ও ড্রাই ফ্রুটসের অবাধ আমদানি এসব অঞ্চলের উৎপাদকদের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির পর কাশ্মীর উপত্যকার আপেলচাষিরাও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তাঁদের শঙ্কা, কম দামে বিদেশি আপেল বাজারে ঢুকে পড়লে দেশীয় উৎপাদন মার খাবে।
কাশ্মীর ভ্যালি ফ্রুট গ্রোয়ার্স কাম ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বশির আহমেদ এ বিষয়ে প্রতিকারের আশায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে একটি দাবিপত্র জমা দিয়েছেন। দাবিপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, উপত্যকার প্রায় সাত লাখ পরিবার আপেল উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের জন্য ভারতের বাজার শুল্কহীনভাবে উন্মুক্ত হলে এসব পরিবার চরম সংকটে পড়বে।
বশির আহমেদ বলেন, ভারতীয় আপেলের জন্য বিদেশে কার্যকর বাজার তৈরি করা যায়নি, অথচ বিদেশি আপেল দেশের বাজারে আগেই প্রভাব বিস্তার করেছে। এখন অবাধ আমদানি শুরু হলে আপেল ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং পথে বসা ছাড়া তাঁদের আর কোনো উপায় থাকবে না।

