ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা এখন চরম পর্যায়ে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে সামান্য ভুল হিসাবই বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এই টানটান আবহে আরব সাগরে যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিংকনসহ একাধিক ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন করেছে মার্কিন প্রশাসন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন এই পদক্ষেপকে অনেকেই ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন।
ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক ও সামরিক মহলে আশঙ্কা—যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
উত্তেজনা প্রশমনের উদ্দেশ্যে গত শুক্রবার ওমানের রাজধানী মাসকটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তবে ওই বৈঠক শেষ হওয়ার পরও আশাবাদী হতে পারেনি মার্কিন প্রশাসন। আলোচনার ফলাফলকে তারা সন্তোষজনক মনে করেনি বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
বরং আলোচনা শেষ করেই ইরানের তেল পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের সামনে কঠোর কিছু শর্ত তুলে ধরেছে—
পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করা,
দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচি পরিত্যাগ করা,
এবং আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতা সীমিত করা।
কিন্তু এসব শর্তে ইরান মোটেও নরম হয়নি।
তেহরান বরাবরের মতোই দ্ব্যর্থহীন অবস্থান জানিয়েছে। ইরান বলছে, তারা কূটনৈতিক আলোচনার পথ বন্ধ করেনি, তবে একই সঙ্গে যুদ্ধের জন্যও পুরোপুরি প্রস্তুত।
সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এক কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন,
“আমাদের সেনাবাহিনীর আঙুল ট্রিগারে রয়েছে। নির্দেশ পেলেই যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হবে।”
এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয়—ইরান কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে রাজি নয়।
উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক তৎপরতায় পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইল। দখলদার ইসরাইলের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে মার্কিন প্রশাসনকে জানিয়ে দিয়েছেন—ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি তাদের অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি।
এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ইসরাইল একটি স্পষ্ট ‘রেড লাইন’ বা লাল রেখা টেনে দিয়েছে। সেই সীমা অতিক্রম করলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অপেক্ষায় না থেকে এককভাবে সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠকে ইসরাইল তাদের এই অবস্থান স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে। আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও উৎপাদন অবকাঠামো ধ্বংসের সম্ভাব্য পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।
ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে ইরানের ভেতরে থাকা মূল উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে সরাসরি হামলার পরিকল্পনা তাদের হাতে প্রস্তুত রয়েছে।
একজন সূত্রের ভাষায়,
“আমরা আমেরিকানদের পরিষ্কারভাবে বলেছি—ইরান যদি ব্যালিস্টিক মিসাইল নিয়ে আমাদের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে, তাহলে আমরা একাই হামলা চালাব।”
সূত্রগুলো আরও জানায়, এখনো ইরান সেই চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেনি। তবে ইসরাইল গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে ইরানের ভেতরের প্রতিটি সামরিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
অর্থাৎ পরিস্থিতি আপাতত স্থিতিশীল মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে জমে উঠছে সংঘাতের উপাদান।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন দাঁড়িয়ে আছে এক বিপজ্জনক মোড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, ইরানের কঠোর অবস্থান এবং ইসরাইলের একক হামলার হুমকি—এই তিন শক্তির সমীকরণ যেকোনো সময় বড় সংঘাত ডেকে আনতে পারে। প্রশ্ন শুধু একটাই—এই উত্তেজনা কি আলোচনার টেবিলে থামবে, নাকি যুদ্ধক্ষেত্রে?

