ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা নতুন করে বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছে। পারস্য উপসাগর ও আশপাশের অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ার পর এবার সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন—যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ভূখণ্ডে কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত প্রতিটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
একটি কঠোর বার্তায় আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার সক্ষমতা না থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের নাগালের মধ্যেই রয়েছে। এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে—যুদ্ধ হলে আঞ্চলিক ময়দানেই তার জবাব দেওয়া হবে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উদ্দেশে একটি শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ বহর পাঠানোর ঘোষণা দেন। ওয়াশিংটন এই সামরিক তৎপরতাকে “শান্তি রক্ষার শক্তি” হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও ইরানের চোখে এটি সরাসরি উস্কানি।
এই প্রেক্ষাপটেই আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন,
ইরান যুদ্ধকে ভয় পায় না এবং তাদের সামরিক বাহিনী যেকোনো আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দিতে প্রস্তুত।
তিনি আরও পরিষ্কার করেন, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোকে টার্গেট করবে না। তবে ওইসব দেশের ভেতরে থাকা মার্কিন সামরিক অবকাঠামোই হবে মূল লক্ষ্য।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হাতে রয়েছে প্রায় দুই হাজার স্বল্প ও মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইলের বিশাল ভাণ্ডার। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও এই মিসাইল শক্তিই এখন ইরানের প্রধান প্রতিরোধ কৌশল।
বিশেষ করে খুররমশাহর ও সেজজিল শ্রেণির ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এর ফলে—
-
কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি
-
বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর সদর দপ্তর
-
কুয়েত, ইরাক ও সিরিয়ার বেশিরভাগ মার্কিন সামরিক স্থাপনা
সবই এখন ইরানের সরাসরি মিসাইল ছায়ার আওতায়। এমনকি তুরস্কের ইনজিরলিক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা ঘাঁটিও এই ঝুঁকির বাইরে নয়।
বিশেষজ্ঞরা ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে তুলনা করছেন একটি ‘সুইস আর্মি নাইফ’-এর সঙ্গে—যা একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা, প্রতিশোধ ও শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
গত বছর ইসরায়েলের দিকে প্রায় ৫০০ মিসাইল নিক্ষেপ করে ইরান তাদের সক্ষমতার একটি বার্তা দিয়েছিল। যদিও সেই হামলায় বড় ধরনের ধ্বংস হয়নি, তবুও এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য ছিল গভীর। ঠিক এই কারণেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন এখন ইরানের হুমকিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
সম্ভাব্য ইরানি প্রতিশোধ ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে থাড ও প্যাট্রিয়ট মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
বিশেষ করে—
-
জর্ডান
-
কুয়েত
-
সৌদি আরব
এই দেশগুলোতে বাড়তি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি মোতায়েন করা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এটি মূলত বড় ধরনের যুদ্ধ এড়ানো এবং অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ।এই উত্তেজনার মধ্যেও পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওমানে পরোক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে আরাঘচি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে কোনো আপস করবে না তেহরান।
তিনি আরও বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তা বন্ধ করার বিষয়ে ওয়াশিংটনের কোনো দাবিই ইরান মেনে নেবে না। কারণ এসব বিষয় তাদের জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সব মিলিয়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এখন এক ভয়ংকর সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কঠোর সামরিক বার্তা, অন্যদিকে ইরানের “ট্রিগারে আঙুল রাখা” হুঁশিয়ারি—এই দুই শক্তির মুখোমুখি অবস্থান পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে ঠেলে দিচ্ছে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে।
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না এলে এই উত্তেজনা যে কোনো সময় একটি বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, পড়তে পারে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর।

