ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন বহু আগেই যুদ্ধাপরাধের সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এবার সেই নৃশংসতার আরও ভয়াবহ এক চিত্র উঠে এসেছে আলজাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে—যা যে কাউকে শিউরে উঠতে বাধ্য করবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় এমন ভয়ংকর বোমা ব্যবহার করছে ইসরাইলি বাহিনী, যা বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা তৈরি করছে। এই প্রচণ্ড তাপে মুহূর্তের মধ্যেই মানুষের শরীর বাষ্পে পরিণত হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই নিহতদের কোনো দেহাবশেষ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না।
২০২৪ সালের ১০ আগস্ট ভোরে গাজা শহরের আল-তাবিন স্কুলে চালানো এক হামলার দৃশ্য আজও দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে ফেরে ইয়াসমিন মাহানিকে। ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে নিজের ছেলে সাদের খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন তিনি। চারপাশে ঘন ধোঁয়া, আগুন আর আর্তচিৎকারের মাঝে কোথাও সাদের কোনো চিহ্ন নেই। একপর্যায়ে তিনি মসজিদের ভেতরে ঢুকে দেখেন—চারদিকে শুধু রক্ত আর ছিন্নভিন্ন মাংসের স্তূপ।
দিনের পর দিন হাসপাতাল ও মর্গে খুঁজেও সাদের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি মাহানি। কণ্ঠ ভারী করে তিনি বলেন, “আমরা তার দাফনের জন্য শরীরের একটি অংশও পাইনি। এই যন্ত্রণার কোনো ভাষা নেই।”
মাহানির মতো হাজারো পরিবার গাজায় আজ একই বিভীষিকায় দিন কাটাচ্ছে। ইসরাইলি আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হলেও আরও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ, যাদের অনেকেই কার্যত ‘বাষ্পীভূত’ হয়ে গেছে।
আলজাজিরা অ্যারাবিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দ্য রেস্ট অব দ্য স্টোরি জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া হামলায় গাজার সিভিল ডিফেন্স বিভাগ ২ হাজার ৮৪২ জন ফিলিস্তিনিকে নথিভুক্ত করেছে, যাদের দেহের কোনো পূর্ণাঙ্গ চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কোথাও কোথাও শুধু রক্তের দাগ বা পোড়া মাংসের ক্ষুদ্র অংশ মিলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ তাপীয় ও থার্মোবারিক অস্ত্র—যাকে ভ্যাকুয়াম বা অ্যারোসল বোমাও বলা হয়। এই বোমার বিস্ফোরণে সৃষ্ট ভয়ংকর তাপ ও চাপ মুহূর্তেই মানবদেহকে ধ্বংস করে দেয়।
গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, তাদের এই সংখ্যা কোনো অনুমান নয়, বরং ভয়াবহ ফরেনসিক যাচাইয়ের ফল। তিনি বলেন, “আমরা হামলার শিকার প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে সেখানে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যার সঙ্গে উদ্ধার হওয়া মরদেহ মিলিয়ে দেখি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানুষ ছিল—কিন্তু লাশ নেই।”
এই বাস্তবতা গাজায় চলমান আগ্রাসনের ভয়াবহতা নতুন মাত্রায় তুলে ধরছে, যেখানে মৃত্যু নয়—মানুষই যেন সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

