মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও শুল্কনীতি নিয়ে আলোচনায়। গত ২ এপ্রিল বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন তিনি। তবে ঘোষণার পর থেকে অবস্থান বারবার বদলাচ্ছেন। এখন মূলত শুল্কহার পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। কার্যত কিছু ক্ষেত্রে হার কমানো হলেও, সামগ্রিকভাবে শুল্ক আগের তুলনায় বেশি রয়ে গেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাড়তি শুল্কের ভার শেষ পর্যন্ত কে দিচ্ছে? বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক–এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শুরুতে আমদানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্কহার ছিল ২ দশমিক ৬ শতাংশ। ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ শতাংশে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, মেক্সিকো, চীন, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্যে আরোপিত বাড়তি শুল্কের প্রায় ৯০ শতাংশই বহন করেছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো।
গবেষণার মূল পর্যবেক্ষণ হলো, রপ্তানিকারক দেশগুলো তাদের পণ্যের দাম কমায়নি। তারা আগের মূল্যই ধরে রেখেছে। ফলে অতিরিক্ত শুল্কের পুরো ব্যয় পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকদের ওপর। পরে এসব কোম্পানি খুচরা বাজারে দাম বাড়িয়ে সেই ব্যয় ভোক্তাদের ওপর চাপিয়েছে।
নিউইয়র্ক ফেড স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যখন শুল্ক আরোপ শুরু হয়, তখনও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। ভোক্তা পর্যায়ে দাম বেড়েছিল। তবে বৃহত্তর অর্থনীতিতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন তখন স্পষ্ট হয়নি।
জার্মানির কেইল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমি ২ কোটি ৫০ লাখ লেনদেন বিশ্লেষণ করে দেখেছে, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি পণ্যের দামে শুল্কের পূর্ণ প্রভাব পড়েছে। অর্থাৎ দাম বেড়েছে। ব্রাজিল ও ভারতের মতো দেশগুলো দাম কমায়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির পরিমাণ কমিয়েছে।
একই ধরনের ফল দিয়েছে ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ–এর বিশ্লেষণ। তাদের মতে, শুল্কের প্রায় শতভাগই আমদানি মূল্যে যুক্ত হয়েছে। ফলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকেই বহন করতে হচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ট্যাক্স ফাউন্ডেশন–এর হিসাব বলছে, ২০২৫ সালে শুল্ক বৃদ্ধির কারণে প্রতিটি মার্কিন পরিবারের গড় ব্যয় বেড়েছে প্রায় এক হাজার ডলার। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ১ হাজার ৩০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুল্ক কার্যত ভোক্তাদের ওপর আরোপিত এক ধরনের নতুন কর। এমনকি দাম বাড়ার কারণে মানুষ কম পণ্য কিনলেও কার্যকর গড় শুল্কহার এখন ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। ১৯৪৬ সালের পর যা সর্বোচ্চ।
তাদের আরও আশঙ্কা, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘বিগ বিউটিফুল বিল’-এ থাকা করছাড়ের সম্ভাব্য সুফল এই বাড়তি শুল্কের চাপে অনেকটাই ম্লান হয়ে যেতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, শুল্ক বাড়ালে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা পাবে এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকাশিত গবেষণা বলছে, রপ্তানিকারক দেশগুলো দাম কমিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পথ নেয়নি। ফলে শুল্কের বোঝা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ও ভোক্তাদের ওপর পড়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা ভোক্তা ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে এটি করনীতি ও বাণিজ্যনীতির মধ্যে নতুন বিতর্ক তৈরি করছে।
শুল্ককে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হলেও, এর আর্থিক অভিঘাত এখন স্পষ্ট। প্রশ্ন রয়ে গেছে, ভবিষ্যতে শুল্কহার পুনর্নির্ধারণের এই ধারা কতটা স্থায়ী হবে এবং তার প্রভাব কতদূর গড়াবে।

