সিএনএনের বিশ্লেষণ—
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে যা খুশি তা–ই করার অধিকার আমার আছে।’ তবে ট্রাম্পের সেই দিন এখন আর আগের মতো যাচ্ছে না। সব সময় আর নিজের ইচ্ছা খাটাতে পারছেন না তিনি।
ট্রাম্প অবশ্য এখনো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার বাসনা ছাড়েননি। তবে এখন তিনি প্রতি পদক্ষেপে ছোট ছোট কিন্তু উল্লেখযোগ্য কিছু প্রতিরোধের মুখে পড়তে শুরু করেছেন।
প্রতি সপ্তাহেই ট্রাম্পের প্রতি মানুষের ভয় একটু একটু করে কমছে। এমনকি নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির সদস্যদের মধ্যেও এখন জড়তা কাটতে শুরু করেছে। তিনি এখন রাজনৈতিক তৎপরতা, আদালত, সাধারণ নাগরিক এবং নির্বাচনী রাজনীতির ক্ষেত্রেও বাস্তবতার মুখোমুখি। তাঁর প্রিয় কিছু নীতি ও ব্যক্তিগত লক্ষ্যকে অনেকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন।
ট্রাম্পের পিছুটান
গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প প্রশাসনের ‘বর্ডার জার’ টম হোম্যান মিনেসোটা থেকে হাজারো ফেডারেল কর্মকর্তা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চার হাজারের বেশি গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। তবে মাঠপর্যায় থেকে এমন আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে সরে আসা একধরনের পিছু হটাই বলা যায়। রেনি গুড ও অ্যালেক্স প্রেটি নামে দুই মার্কিন নাগরিককে হত্যার ঘটনায় চলা ব্যাপক বিক্ষোভ ও জনরোষের মুখেই এমন সিদ্ধান্ত এল। মূলত মিনেসোটাতে ট্রাম্পের শুদ্ধি অভিযানের রাজনীতি আর টেকসই হচ্ছিল না।
মিনেসোটার ডেমোক্রেটিক গভর্নর টিম ওয়ালজ একে ‘নজিরবিহীন আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করে এর অবসানের ঘোষণা দেন। এই সংঘাতের ফলে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ওয়ালজ বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা বলা এখন নিরাপদ যে পুরো দেশ আমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। কারণ, আমরা দেখিয়েছি ন্যায়ের পক্ষে কীভাবে রুখে দাঁড়াতে হয়।’
বড় বাধা আদালত
ট্রাম্পের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পথে আদালতও এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কিছু বড় সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষেই গেছে। গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের একটি আদালত নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন ও অ্যারিজোনার ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক কেলির বিরুদ্ধে আনা ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কেলিকে শাস্তি দেওয়ার এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
এক বিবৃতিতে কেলি বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন আমাকে শাস্তি দিতে বা অন্যদের মুখ বন্ধ করতে যত কঠোরভাবেই লড়াই করুক না কেন, আমি তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলব। এটি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’ এর আগে একটি গ্র্যান্ড জুরিও কেলি ও অন্য পাঁচ ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের আনা অভিযোগপত্র গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়।
ট্রাম্পের বিরোধিতা
কানাডার ওপর ট্রাম্পের চাপানো শুল্ক বাতিলের পক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিয়েছেন ছয় রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা। তাঁদের এই পদক্ষেপ মূলত ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির ফলে ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে দলের ভেতরে থাকা উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ।
এর পাশাপাশি হাউস স্পিকার মাইক জনসনের একটি প্রচেষ্টাও ব্যর্থ করে দিয়েছেন তিন রিপাবলিকান সদস্য। জনসন চেয়েছিলেন ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো ভোটাভুটির পথ বন্ধ করতে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও দেশটির মিত্ররা এখন ট্রাম্পকে ছাড়াই চলার পথ খুঁজছেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বিশ্বের মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে বড় শক্তিগুলোর দাদাগিরির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের ক্ষমতা
দেশের অভ্যন্তরে ট্রাম্পের প্রতাপ এখনো প্রবল। গত বৃহস্পতিবার তিনি পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে নিজের সেই শক্তিরই মহড়া দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ওবামা এবং বাইডেন প্রশাসনের জলবায়ুবিষয়ক অর্জনগুলোকে কার্যত ধূলিসাৎ করে দেবে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করতে মার্কিন বাহিনীর দুঃসাহসিক অভিযানই প্রমাণ করে, ট্রাম্পের হাতের মুঠোয় কতটা ক্ষমতা রয়েছে। দলের ভেতরে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ এখনো অটুট।
ট্রাম্পবিরোধীদের এই ছোট ছোট জয় হয়তো স্বল্প মেয়াদে তাঁর ক্ষমতাকে টলাতে পারবে না। তবু ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত নিজেদের অথবা নিজ এলাকার ভোটারদের স্বার্থ রক্ষায় অনেক আইনপ্রণেতাই হয়তো প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে হাঁটতে বাধ্য হবেন। বর্তমানে জরিপগুলোতে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার নিম্নমুখী অবস্থান বিরোধীদের আরও উৎসাহিত করছে। সিএনএনের সব জরিপের গড়ে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা এখন ৩৯ শতাংশে আটকে আছে।

