ছোট দেশ হলেও মধ্যপ্রাচ্যের বৃহৎ স্বর্ণভাণ্ডারের মালিক লেবানন। এখন সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন—পঙ্গু অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে কি স্বর্ণ ব্যবহার করবে, নাকি শেষ আশ্রয় হিসেবে সংরক্ষণ করবে? সাধারণ লেবানিজরা ক্রমেই স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন, যাতে সঞ্চয় রক্ষার নিশ্চয়তা পান।
বৈরুতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৯৬০-এর দশক থেকে ২৮৬ টন (প্রায় ৯০ লাখ আউন্স) স্বর্ণ রিজার্ভ হিসেবে ধরে রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছেই এর তুলনা করা যায়। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ড স্তরে উঠায় লেবাননের স্বর্ণভাণ্ডারের মূল্য পৌঁছেছে প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার, যা দেশের জিডিপির দ্বিগুণের বেশি।
লেবানন বহু বছর ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে রয়েছে। ২০১৯ সালের শেষ দিকে ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়লে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সাধারণ আমানতকারীরা প্রায় সব সঞ্চয় হারান। দেশের ৬৫ লাখ জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি তখন দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসে। কয়েক দশকের দুর্নীতি, অপচয় এবং অব্যবস্থাপনা এই পরিস্থিতিকে তীব্র করেছে। মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার কোটি ডলার। ২০২৪ সালে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘাতের কারণে আর্থিক ক্ষতি আরও ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার বেড়ে যায়।
বর্তমানে সরকার ভাবছে, স্বর্ণভাণ্ডারের একটি অংশ ব্যবহার করে ধসে পড়া ব্যাংকগুলোকে রক্ষা এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়া সম্ভব কি না। তবে এই প্রক্রিয়া সহজ নয়। কারণ ১৯৮৬ সালে গৃহযুদ্ধের সময় প্রণীত আইন অনুযায়ী স্বর্ণ বিক্রি নিষিদ্ধ। সেই আইন আজও বহাল আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “কিছু ব্যাংক প্রস্তাব দিচ্ছে, মুদ্রাসঙ্কটে উবে যাওয়া আমানতের টাকা ফেরত দিতে স্বর্ণ ব্যবহার করা হোক। এটি হতে পারে সরকারি সম্পদ দিয়ে ব্যাংকগুলোর আংশিক উদ্ধার।”
কিছু অর্থনীতিবিদ প্রস্তাব করছেন, স্বর্ণের কিছু অংশ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত পুনর্গঠন করা যেতে পারে। তবে যেকোনো ব্যবহারের জন্য সংসদের ভোট প্রয়োজন। বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে সংসদ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা কম। সম্প্রতি সংসদে স্বর্ণ বিষয়ক আলোচনা উঠলে স্পিকার নাবিহ বেরি দ্রুত তা বন্ধ করে দেন।
আমানতকারীদের ক্ষতির আংশিক ফেরত দেয়ার খসড়া আর্থিক ঘাটতি আইনও এখনও সংসদে আটকে আছে। বিতর্কের মূল প্রশ্ন—ক্ষতির বোঝা কে নেবে? দুর্বল ব্যাংক নাকি ঋণে জর্জরিত রাষ্ট্র? দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক সংস্কার এড়িয়ে যাওয়ায় সাধারণ লেবানিজরা কর্তৃপক্ষের ওপর আস্থা হারিয়েছেন। অনেকের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্বর্ণভাণ্ডার অক্ষত রাখা শ্রেয়।
রাষ্ট্র দ্বিধার মধ্যে থাকলেও সাধারণ লেবানিজরা হাতে কিছু সম্পদ রাখার চেষ্টা করছেন। ব্যাংকের ওপর ভরসা না করে তারা স্বর্ণ ও রুপা কিনছেন। বোগোস এসএএল প্রেশাস মেটালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস বোগোস বলেন, “যারা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চাইছেন, তাদের জন্য স্বর্ণই একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়।”
চাহিদা এত বেশি যে ক্রেতারা অগ্রিম টাকা দিয়ে কয়েক মাস পর স্বর্ণ ও রুপার জন্য অপেক্ষা করছেন। বৈরুতভিত্তিক থিংক ট্যাংক দ্য পলিসি ইনিশিয়েটিভের অর্থনীতিবিদ সামি জুঘাইব বলেন, “সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে স্বর্ণ কেনার প্রবণতা লেবাননের মানুষের মধ্যে সবসময় ছিল। দেশটি বহুবার অতি মূল্যস্ফীতি দেখেছে।”

