বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কোনো একক ইস্যুতে আটকে থাকবে না বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করলেও তা দুই দেশের বিস্তৃত সম্পর্কের পথে বাধা হবে না বলে জানান তিনি।
আগামীকাল মঙ্গলবার বিএনপির নতুন সরকার শপথ নেবে। সরকার গঠনের আগের দিন আজ সোমবার ১৬ ফেব্রুয়ারি গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু–কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, যেসব প্রকল্পে বাংলাদেশের স্বার্থ জড়িত সেগুলো এগিয়ে নেওয়া হবে। ভারতের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারত্ব আরও জোরদার করা হবে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত বলে তাদের বিশ্বাস। জনগণের বড় অংশ তাকে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি তুলেছে। বিএনপি মনে করে, ভারত সরকারের উচিত তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা। তবে ভারত যদি তাকে ফেরত না-ও দেয়, তবু বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কসহ সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তা বাধা হবে না। বৃহত্তর সম্পর্ককে একটি মাত্র ইস্যুর কাছে জিম্মি করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ভারতে আশ্রয় নেন। গত ১৭ মাস ধরে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের প্রত্যর্পণের জন্য নয়াদিল্লির কাছে অনুরোধ জানালেও এখনো সাড়া মেলেনি। এ বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, শেখ হাসিনা, তার মন্ত্রিসভার সদস্য ও কয়েকজন আমলার বিরুদ্ধে হত্যা ও ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
শেখ হাসিনার আমলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কারাবন্দী হলে দলের নেতৃত্বে সামনে আসেন মির্জা ফখরুল। সে সময় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে ছিলেন। তিনি বলেন, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছু জটিল ইস্যু আছে। কিন্তু সেগুলো সহযোগিতার ক্ষেত্রকে ছাপিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
|
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও তারা পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখছে। বাংলাদেশ ও ভারতের ক্ষেত্রেও একটি মাত্র ইস্যুতে আটকে থাকা ঠিক হবে না। -বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর |
|---|
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর যখন শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরা ভারতে ছিলেন, তখন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ভারত সফর করেন। তিনি ঢাকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই–কে আতিথ্য দেন। পরে ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে দিল্লি গিয়ে ইন্দিরা গান্ধী–র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় শেখ হাসিনা দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মির্জা ফখরুলের ভাষায়, সেটিই ছিল রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃষ্টিভঙ্গি।
তিনি জানান, আগামী বছরের আগেই গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির নবায়নের প্রসঙ্গ আসবে। ফারাক্কার পানির বিষয়টি সামনে আসবে। পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা নিয়েও আলোচনা জরুরি। এসব বিষয়ে খোলামেলা কথা বলতে হবে।
ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট অবস্থান নেন। তার ভাষায়, ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ সম্ভব নয়। আলোচনাই একমাত্র পথ। যারা যুদ্ধের কথা বলে তারা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করছে।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন তিনি। প্রতিশোধ ও সহিংসতা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেন। ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় সমঝোতা গড়ে তুলতে পারেনি বলে তার দাবি। তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের নেতারা মুহাম্মদ ইউনূস–কে দায়িত্বে এনেছিলেন। কিন্তু তিনি নির্ধারিত সীমার বাইরে যেতে পারেননি।
গত রোববার ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তিনি জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। রাজনৈতিক সমঝোতার পক্ষে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও একই অবস্থান নিয়েছেন।
বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচিকে তিনি দুই দেশের সম্পর্ক নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ হিসেবে দেখছেন। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের মতো খাতে যৌথ উদ্যোগের কথা বলেন তিনি।
তার মতে, ভারতের কারিগরি শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রয়েছে। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক বেকার তরুণের দক্ষতা বাড়াতে সহযোগিতা প্রয়োজন। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
তিনি আরও জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের চাপ নতুন সরকারকে সামলাতে হবে। বড় বড় প্রকল্প পর্যালোচনা করা হবে। যেসব প্রকল্প বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে সেগুলোই রাখা হবে।
সূত্র: দ্য হিন্দু

