আর্জেন্টিনায় এখন এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে বহু মানুষ ঘর ভাড়া নয়, গাড়ি নয়—খাবার কিনতেও ঋণ নিচ্ছেন। সঞ্চয় ভেঙে, ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করে, কিংবা ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন তারা।
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশটির গড় নাগরিক এখন দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। দীর্ঘদিন ধরেই আর্জেন্টিনায় ঋণ একটি বড় সমস্যা ছিল, কিন্তু এখন তা সংকটে রূপ নিয়েছে।
মাসের মাঝামাঝি শেষ হয়ে যায় বেতন
বুয়েনোস আইরেসের উপকণ্ঠের শহর ফ্লোরেনসিও ভারেলায় একটি বড় হার্ডওয়্যার দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে পূর্ণকালীন কাজ করেন ৪৩ বছর বয়সী দিয়েগো নাকাসিও। স্ত্রীও একটি দোকানে পূর্ণকালীন কাজ করেন।
নাকাসিও বলেন, ক্যালেন্ডার দেখার দরকার হয় না—বেতন কখন শেষ হয়ে যায় তা তারা বুঝে যান। সাধারণত মাসের ১৫ তারিখের মধ্যেই দুজনের আয় ফুরিয়ে যায়। এরপর শুরু হয় টিকে থাকার লড়াই। অতিরিক্ত কাজ খোঁজা, পুরোনো জিনিস বিক্রি, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার, ছোট ঋণ নেওয়া—সবই করতে হয় পরবর্তী বেতন না আসা পর্যন্ত।
তিনি বলেন, “২৫ বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করেছি। আমাদের চাকরির আয়ে বাড়ি বানিয়েছি, গাড়ি কিনেছি, ছেলেকে ভালোভাবে বড় করেছি। এখন আগের চেয়ে ভালো চাকরি করেও পুরো মাসের খাবার কিনতে পারি না।”
তার ভাষায়, “ক্রেডিটে বাঁচা খুব বিপজ্জনক। কিস্তি দিতে দেরি হলেই এক ভয়াবহ চক্রে পড়ে যাওয়া লাগে। আমরা সবসময় মানসিক চাপের মধ্যে থাকি।”
পরিসংখ্যান বলছে সংকটের চিত্র
আর্জেন্টিনা গ্রান্ডের সর্বশেষ সরকারি তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক মানুষ দৈনন্দিন খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙছেন, জিনিস বিক্রি করছেন অথবা ব্যাংক ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছেন।
ফুন্দাসিওন পেনসারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬৩ শতাংশ আর্জেন্টাইন খরচ কমাতে বিভিন্ন কার্যক্রম বা সেবা কমিয়ে দিয়েছেন।
গবেষক ভায়োলেতা কারেরা পেরেইরা বলেন, “এখন মানুষ বাড়ি বা গাড়ি কেনার জন্য নয়, খাবার কেনার জন্য ঋণ নিচ্ছে। এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
দুই বাস্তবতার আর্জেন্টিনা
ডিসেম্বর ২০২৩-এ দায়িত্ব নেওয়া প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই দাবি করেন, তার কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কার দেশকে পুনরুজ্জীবিত করেছে এবং লাখো মানুষকে দারিদ্র্য থেকে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ ও ২০২৭ সালে চার শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।
কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রবৃদ্ধি সমানভাবে হয়নি। ২০২৫ সালের নভেম্বরের তথ্য অনুযায়ী ব্যাংকিং ও কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হলেও উৎপাদন ও বাণিজ্যে বড় পতন হয়েছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় বহু কারখানা ও দোকান বন্ধ হয়েছে। স্বাধীন খাদ্য খুচরা বিক্রেতারা ১২.৫ শতাংশ বিক্রি কমার কথা জানিয়েছেন।
মুদ্রাস্ফীতি ও বাস্তবতা
মিলেই প্রশাসন ক্ষমতায় এসে রেকর্ড উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সক্ষম হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, বেতন স্থবির রাখা এবং সস্তা আমদানি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ অনেকের আয় কমিয়ে দিয়েছে।
সমস্যা আরও জটিল হয়েছে কারণ মুদ্রাস্ফীতি পরিমাপের ঝুড়ি ২০০৪ সালের ভিত্তিতে তৈরি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো খাতে মূল্যবৃদ্ধি বাস্তব খরচের তুলনায় অনেক বেশি হলেও তা পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।
ঋণের ফাঁদ
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, আর্জেন্টিনায় সুপারমার্কেটের প্রায় অর্ধেক কেনাকাটা এখন ক্রেডিট কার্ডে পরিশোধ করা হচ্ছে—যা একটি রেকর্ড।
ব্যক্তিগত ঋণের প্রায় ১১ শতাংশ অনাদায়ী, যা ২০১০ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেকর্ড রাখা শুরু করার পর সর্বোচ্চ।
গ্রিসেলদা কুইপিলদর বলেন, “মাসের শুরুতে পুরোনো দেনা ও বিল দিই, তারপর আবার ধার করতে হয়। এটা এক অন্তহীন চক্র।”
অনানুষ্ঠানিক ঋণদাতার বিস্তার
বিশ্লেষক লুসিয়া কাভালেরো বলেন, অনানুষ্ঠানিক ঋণদাতাদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়েছে। অনেকেই উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
একটি রাজনৈতিক দল নিম্ন আয়ের মানুষদের ঋণ একত্রিত করে দীর্ঘমেয়াদি কম সুদের পরিকল্পনা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে কাভালেরোর মতে, এটি সাময়িক সমাধান। মূল সমস্যা হলো আয় ও নিত্যপণ্যের দামের ভারসাম্যহীনতা।
তিনি বলেন, “ব্যাংকগুলো যেমন সহায়তা পায়, তেমনি পরিবারগুলোকেও সহায়তা করতে হবে। টেকসই সমাধান হলো মজুরি যেন নিত্যপণ্যের খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে।”
সব সংকটের মধ্যেও নাকাসিও বলেন, অন্তত নিজের বাড়ি আছে বলে তারা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করেন। “ভাড়া দিতে হলে কী করতাম জানি না। আমাদের সবার জন্যই পরিবর্তন দরকার। এভাবে চলতে পারে না।”

