সোমালিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ মোয়াল্লিম ফিকির প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের প্রশংসা করেন, যখন তিনি ঘোষণা করেন যে তিনি এবং সৌদি আরবের যুবরাজ খালিদ বিন সালমান সৌদি রাজধানী রিয়াদে একটি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন।
চুক্তির সুনির্দিষ্ট বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। তবে সোমালি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, সমঝোতা স্মারকটি “দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা জোরদার করে এবং এতে সাধারণ স্বার্থের একাধিক ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।”
পৃথকভাবে, প্রিন্স খালিদ বিন সালমান এক্স-এ বলেন: “আমরা নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেছি এবং সুযোগগুলো স্বীকৃতি দিয়েছি।” সোমালিয়া, স্লোভাকিয়া, মালয়েশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি এই মন্তব্য করেন।

সোমালিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্ন অঞ্চল সোমালিল্যান্ডকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ পরেই সৌদি আরবের সঙ্গে সোমালিয়ার এই সামরিক চুক্তি সম্পন্ন হয়। সোমালিয়া ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে জানায়, এটি সোমালিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ।
গত মাসে সোমালিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানায়, সোমালিয়া কাতারের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার লক্ষ্য “সামরিক সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা।” সংস্থাটি আরও জানায়, চুক্তিটি সামরিক প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।
উপসাগরীয় দেশগুলো প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা করছে।

বিবিসির প্রাক্তন সোমালি সম্পাদক এবং হর্ন অব আফ্রিকা বিশ্লেষক আবদুল্লাহি আবদি শেখ ডিডব্লিউকে বলেন, এই চুক্তি “উভয় দেশের জন্যই অনেক অর্থবহ।”
তিনি বলেন, “সৌদি আরবের জন্য এর অর্থ হলো আদেন উপসাগরে তার প্রভাব ও প্রসার সম্প্রসারণ করা, যা বাব-এল-মান্দেব অঞ্চলের সংলগ্ন এবং বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচলের কমপক্ষে ১০ শতাংশ এই অঞ্চল দিয়ে যায়।
তিনি আরো বলেন, “সৌদি আরব সোমালিয়ায় তার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে এবং সোমালিয়া সৌদি আরবের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর।”
গত বছরে সংযুক্ত আরব আমিরাত আফ্রিকার শিং অঞ্চলে একটি প্রভাবশালী খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে সুদান, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া এবং জিবুতি। বহু-বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, শক্তিশালী কূটনীতি এবং বিচক্ষণ সামরিক সহায়তার মাধ্যমে এই প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইয়েমেনের সংঘাত এবং লোহিত সাগরে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার বাইরেও বেড়েছে। এখন উভয় দেশের দৃষ্টিতে আফ্রিকার শিং অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সপ্তাহান্তে আফ্রিকান ইউনিয়নের শীর্ষ সম্মেলনে একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক রয়টার্সকে বলেন, “সৌদি জেগে উঠেছে এবং বুঝতে পেরেছে যে তারা লোহিত সাগর হারাতে পারে।”
এদিকে আবদি শেখ বলেন, সোমালিয়া-সৌদি আরব সামরিক চুক্তি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তা করার পাশাপাশি সোমালিয়াকে তার নিজস্ব সামুদ্রিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে সহায়তা করবে।
তিনি আরো বলেন, “এটি সেইসব দেশগুলোর প্রভাব কমাতেও সাহায্য করবে, যারা ইসরায়েলের সোমালিল্যান্ড স্বীকৃতির প্রতি সহানুভূতিশীল বলে মনে করা হয়।”

সোমালিয়া অভিযোগ করেছে, ইসরায়েলের সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পদক্ষেপে আমিরাত সহযোগিতা করছে, যা তারা তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। জানুয়ারিতে সোমালিয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তাদের সব চুক্তি বাতিল করে, যার মধ্যে বন্দর পরিচালনা, নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
শেখ সৌদি আরবের সঙ্গে সোমালিয়ার চুক্তিকে “ইসরায়েল এবং তার কথিত মিত্রদের বিরুদ্ধে একটি দাবার চাল” হিসেবে বর্ণনা করেন।
সোমালিয়ার রাষ্ট্রপতি হাসান শেখ মোহাম্মদ বলেন, সোমালিয়া কখনোই সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলি ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেবে না। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, এ ধরনের যেকোনো পদক্ষেপের “প্রতিরোধ” করা হবে।
সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে সতর্ক আশাবাদ প্রকাশ করেছেন সোমালিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষক হাসান হিলোওল আবুকার। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, “সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সহযোগিতার অনেক সুবিধা রয়েছে, যা আমাদের এই এবং অন্যান্য সমস্যা মোকাবিলা করতে সক্ষম করবে।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, সোমালিয়া দশকের পর দশক ধরে অস্থিতিশীলতা এবং বিদ্রোহী সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছে, বিশেষ করে আল-শাবাবের কাছ থেকে।

আবুকার আরো বলেন, সোমালিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ, সজ্জিতকরণ এবং পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি পেলে দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার হবে এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতা বাড়বে, কারণ উভয় দেশ গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করবে।
মোগাদিশুতে বসবাসকারী সোমালি নাগরিক মোহাম্মদ আবদুল্লাহি বলেন, এই সহযোগিতা চুক্তি সোমালিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসেছে, “যেহেতু সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা পরীক্ষা করা হয়েছে, বিশেষ করে ইসরায়েলের সোমালিল্যান্ড স্বীকৃতির পর।”
তিনি আরো বলেন, এই চুক্তি “কেবল সামরিক সহায়তাই নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমর্থনও প্রদান করে।”
সূত্র: ‘ডয়চে ভেলে’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

