ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধ নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই উত্তেজনার মধ্যে ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে সর্ববৃহৎ বিমান শক্তি জড়ো করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, অত্যাধুনিক এফ-৩৫ লাইটনিং ও এফ-২২ র্যাপ্টর স্টিলথ ফাইটারসহ কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ইতোমধ্যে জর্ডানের মুওয়াফ্ফাক সালতি বিমানঘাঁটি এবং সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসে অবস্থান নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেই এই বিশাল সামরিক বহর ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে প্রস্তুত।
শুধু আকাশপথ নয়, সমুদ্রপথেও নিজেদের অবস্থান জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পারস্য উপসাগর ও ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে বর্তমানে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ ১৩টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে।
এর পাশাপাশি দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড তার স্ট্রাইক গ্রুপ নিয়ে এই অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মোতায়েন কেবল শক্তি প্রদর্শনের জন্য নয়—বরং দীর্ঘস্থায়ী বিমান অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা গড়ে তোলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, গত জুনের ‘মিডনাইট হ্যামার’ অপারেশনের মতো একক হামলার পরিবর্তে এবার কয়েক সপ্তাহব্যাপী ধারাবাহিক বিমান অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার বদলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হতে পারে।
তবে এই প্রস্তুতির মধ্যেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে হামলার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি বিবেচনা করছেন এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করছেন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু কী হবে? কেবল ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোতে সীমিত আঘাত, নাকি তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা—এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো রূপরেখা নেই।
এদিকে জেনেভায় দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় কিছু অগ্রগতির খবর পাওয়া গেলেও মৌলিক অবস্থানে উভয় পক্ষই অনড় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশাল শক্তি প্রদর্শনের জবাবে ইরানও তার ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ও আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় রেখেছে। তেহরান স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছে—হামলা হলে তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে।
বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবাহিত হয়। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
প্রাক্তন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এই বিশাল সামরিক সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য ইরানকে একটি কঠিন চুক্তিতে বাধ্য করা। সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করাই হতে পারে ওয়াশিংটনের কৌশল।
গত সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “আমি মনে করি না যে তারা (ইরান) চুক্তি না করার পরিণাম ভোগ করতে প্রস্তুত।”
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, কূটনৈতিক দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে সামরিক প্রস্তুতির মাত্রা যে পরিস্থিতিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর করে তুলেছে, তা বলাই বাহুল্য।

