ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর চার বছর পার হতে চলেছে। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যে আক্রমণের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা, তা আজ দুই দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক হিসাব ছাড়িয়ে মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে।
যুদ্ধের মানচিত্রে দোনবাস ও কামচাটকার অবস্থান একেবারেই ভিন্ন—একটি পূর্ব ইউক্রেনের সংঘাতকেন্দ্র, অন্যটি রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের প্রত্যন্ত উপদ্বীপ। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্ব যতই থাকুক, মানুষের বেদনা যেন একই সুতোয় বাঁধা।
তিনবার বাড়িছাড়া হালিনা
৬৫ বছর বয়সী হালিনা পপরিয়াদুখিনা পূর্ব ইউক্রেনের দোনবাস অঞ্চলের বাসিন্দা। দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক এখন যুদ্ধবিরতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলেও তাঁর কাছে এই নামগুলো কেবল মানচিত্রের সীমারেখা নয়—এগুলো তাঁর জীবনভাঙার ইতিহাস।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি গরুর দুধ দোহন করছিলেন। হঠাৎ ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। সেদিনই শুরু হয় তাঁর বাস্তুচ্যুত জীবনের অধ্যায়।
চার বছরে তিনবার বাড়ি ছাড়তে হয়েছে তাঁকে। প্রথমে কয়েক মাস পশ্চিম ইউক্রেনে আশ্রয় নেন। পরে দোনেৎস্কে ফেরেন। কিন্তু রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা বাড়লে ২০২৫ সালে আবারও পালাতে বাধ্য হন।
এখন তিনি মধ্য ইউক্রেনের এক গ্রামে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া জরাজীর্ণ একটি বাড়িতে থাকেন। তাঁর গ্রাম ভ্রেমিভকা এখন রুশ নিয়ন্ত্রণে। এক ছেলে নিখোঁজ, ধারণা করা হয় আরেকজন বন্দি। তাঁর কণ্ঠে একটাই কথা—
“সব হারিয়েছি। জমি নয়, মানুষই আসল।”
সংখ্যায় যুদ্ধের মূল্য
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ৫৫ হাজার ইউক্রেনীয় নিহত হয়েছেন।
বেসরকারি অনুমানে নিহতের সংখ্যা দুই লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
৭০ হাজারের বেশি সেনা ও বেসামরিক মানুষ নিখোঁজ।
দেশের ভেতরে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত।
আরও ৫০ লাখের বেশি মানুষ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়—প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি ভাঙা স্বপ্ন।
কামচাটকার ছোট্ট গ্রামেও যুদ্ধের ছায়া
যুদ্ধ শুধু ইউক্রেনেই ক্ষত তৈরি করেনি। রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের কামচাটকা উপদ্বীপের ছোট গ্রাম সেদাঙ্কাতেও তার গভীর প্রভাব পড়েছে।
মাত্র ২৫৮ জনের এই মৎস্যগ্রাম। স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী প্রায় সব পুরুষই ইউক্রেন যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন।
৩৯ জন চুক্তিভিত্তিক সেনা হিসেবে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে ১২ জন নিহত, সাতজন নিখোঁজ।
গ্রামটির অধিকাংশ বাসিন্দা আদিবাসী কোরিয়াক ও ইতেলমেন সম্প্রদায়ের। দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারণা অনেককে যুদ্ধে যেতে প্ররোচিত করেছে।
ফলে আজ সেদাঙ্কায় শীতের জ্বালানি কাঠ কাটার লোক নেই। ভগ্নদশায় পড়ে আছে ঘরবাড়ি, জরাজীর্ণ স্কুল। পুরুষশূন্য হয়ে পড়ছে গ্রামটি।
রুশ সেনাদের মৃত্যুর হিসাব
বিবিসির অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই ৪০ হাজারের বেশি রুশ সেনার মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, প্রকৃত সংখ্যা ৮০ হাজারে পৌঁছাতে পারে।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আক্রমণ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত এক লাখ ৮৬ হাজার ১০২ জন রুশ সেনার মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
ভিন্ন ভূগোল, এক বেদনা
দোনবাসের ধ্বংসস্তূপ আর কামচাটকার তুষারঢাকা কবরস্থান—দুটি প্রান্ত, দুটি দেশ। কিন্তু এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
একদিকে ইউক্রেনে বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অন্যদিকে রাশিয়ার জনশূন্য হয়ে পড়া গ্রাম।
চার বছর পরও যুদ্ধের সমাপ্তির স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। কিন্তু প্রতিদিন বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা, নিখোঁজের তালিকা আর শোকের ভার।
মানচিত্রে সীমারেখা বদলাতে পারে, রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টাতে পারে—কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানুষ আর ভেঙে যাওয়া জীবন কি আর ফিরে আসে?

