মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এক ঐতিহাসিক রায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফাভাবে আরোপিত ‘পাল্টা শুল্ক’ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বড় ধাক্কা পেলেও ট্রাম্প হাল ছাড়েননি।
তিনি দ্রুত বিকল্প পথে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। তবে আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের কারণে নতুন শুল্কের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
সুপ্রিম কোর্টের রায় ও ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া:
গত ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, ১৯৭৭ সালের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’ (আইইইপিএ) প্রেসিডেন্টকে একতরফাভাবে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না। এই রায়ের পর হোয়াইট হাউজ জানায়, ওই শুল্ক আর আরোপ করা হবে না এবং তা সংগ্রহও বন্ধ থাকবে।
তবুও ট্রাম্প আদালতের রায়ে থমকে থাকেননি। তিনি ১৯৭৪ সালের ‘ট্রেড এক্সপ্যানশন অ্যাক্ট’-এর ১২২ ধারা ব্যবহার করে নতুন করে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। পরে এটি ১৫ শতাংশে উন্নীত করার কথাও জানান।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই পথ আগের চেয়ে ‘আরও শক্তিশালী’। তবে আইনি ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, ১২২ ধারার ব্যবস্থার মধ্যেও তার পথে রয়েছে বড় বাধা। নতুন শুল্কনীতির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে।
কেন ১২২ ধারা ট্রাম্পের জন্য সহজ নয়?
ট্রাম্প মনে করছেন, এই ধারায় আগের মতোই তার একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকবে। কিন্তু মার্কিন প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস ও আইনি বিশেষজ্ঞরা এ যুক্তি খারিজ করেছেন। ১২২ ধারার তিনটি প্রধান সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
- শুল্কের সীমা ও সময়কাল: প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারবেন এবং তা ১৫০ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে। এই সময় শেষ হলে শুল্ক বজায় রাখতে কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে।
- কঠোর শর্তাবলী: ধারাটি ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক পেমেন্ট বা লেনদেনে বড় ধরনের ঘাটতি প্রমাণ করতে হয়। নিছক রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য শুল্ক ব্যবহার আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
- কংগ্রেসের ক্ষমতা: যদিও প্রতিনিধি পরিষদে ট্রাম্পের দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা আধিক্য ধরে রেখেছে। পাশাপাশি, রিপাবলিকান নেতাদের মধ্যেও অনেকে ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে। ফলে ১৫০ দিনের পর শুল্কের মেয়াদ বাড়ানো কঠিন।
রিপাবলিকানদের নীরব সমর্থন:
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অনেক রিপাবলিকান নেতা নীরবভাবে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। পার্টির বড় অংশ মনে করে, এই শুল্ক মার্কিন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে। একগুঁয়েমি শুল্কনীতি দলের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে দেখা দেয়।
বিচারপতি নীল গোরসাচও মন্তব্য করেছেন, প্রেসিডেন্টকে একা সিদ্ধান্ত নিতে না দিয়ে কংগ্রেসের উচিত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা।
ট্রাম্পের প্রভাব কমছে:
ট্রাম্পের শুল্কনীতির মূল লক্ষ্য ছিল অন্যান্য দেশকে চাপে ফেলে নিজেদের শর্তে বাণিজ্য চুক্তি করা। কিন্তু আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অন্য দেশগুলো এখন জানে, এই শুল্ক দীর্ঘস্থায়ী নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ট্রাম্পের প্রভাব অনেকটাই কমেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ‘দক্ষ ডিল মেকার’ হিসেবে দাবি করেন। তবে ১২২ ধারার আইনি শর্ত ও সীমা তাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক এবং মাত্র ১৫০ দিনের মেয়াদ বিশ্বব্যাপী তার বাণিজ্য পরিকল্পনাকে নড়বড়ে করেছে। আদালত ও কংগ্রেস—উভয় দিক থেকেই আসা এই বাধা ট্রাম্প কীভাবে সামলাবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

