মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, জ্বালানি আমদানি, রপ্তানি খাত ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ–এর চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাতকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
গতকাল রোববার (১৫ মার্চ) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ভয়েস ফর রিফর্মস এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে “ইরান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে যুদ্ধের প্রভাব” শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, যুদ্ধের কারণে রপ্তানি খাত ও প্রবাসী কর্মসংস্থানে ধাক্কা লাগতে পারে। এতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। ইতোমধ্যে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, সরকার প্রয়োজনে স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যয় মেটাতে পারে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার যোগান বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তার মতে, যদি ডলারের ওপর চাপ বাড়ে এবং টাকার মান আবার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়, তাহলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
দেশের জ্বালানি খাতের দুর্বলতার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। মাসরুর রিয়াজ বলেন, ২০১১ সালের পর থেকে দেশে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ রয়েছে। এর ফলে দেশীয় জ্বালানি উৎপাদনে অগ্রগতি হয়নি। তার মতে, এ সময়ে এলএনজি আমদানিনির্ভরতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের প্রভাব শুধু জ্বালানির দাম বা সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। ভর্তুকির চাপ বাড়লে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানির স্থিতিশীলতা, প্রবাসী আয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও এতে প্রভাবিত হতে পারে।
জ্বালানি নীতি পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাসরুর রিয়াজ বলেন, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি আংশিকভাবে অনিবার্য এবং আংশিকভাবে দুর্ভাগ্যজনক। তবে দেশের জ্বালানি নীতি দীর্ঘদিন ধরে সঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সাবাব খান, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ এবং এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সাময়িকীর সম্পাদক মোল্লা আমজাদ হোসেন। সভা সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মসের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। তারা দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর জোর দেন।
তাদের মতে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান জোরদার করা, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং সংকটকালীন সময়ে জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহারে কঠোর সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে অর্থনীতি ও জনজীবনে অনুভূত হতে শুরু করেছে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

