নতুন সরকারের কার্যক্রম নিয়ে অনেকেই পুঁজিবাজারে চাঞ্চল্যের আশা করছেন। এক ব্যবসায়ী বলেছিলেন, এই সরকারের আমলে বাজারে নতুন প্রাণশক্তি আসবে। তার আশাবাদ সম্ভবত যৌক্তিক। তবে, স্মরণীয় বিষয়, গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুঁজিবাজারে বড় ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি। নতুন কোনো আইপিও আসেনি, বাজার মূলধন কমেছে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়েছেন।
পুঁজিবাজারের অচলাবস্থায় মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো উচ্চ সুদহার। বাংলাদেশের মতো বিকাশমান দেশে উচ্চ সুদ হার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ধারাবাহিক তারল্য প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই বাংলাদেশের নতুন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঋণের সুদহার হ্রাস ও বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর প্রস্তাব করেছেন।
কিন্তু কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সময় সুদহার কমানোর চিন্তা তাত্ক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়। একাধিক বিশেষজ্ঞ বলছেন, উচ্চ সুদহার ঋণখেলাপি সংস্কৃতিকে উস্কে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির দেশগুলোতে ঋণের সুদহার ৩৩ শতাংশ থেকে কখনও ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। অন্যদিকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, সৌদি আরব ও ভারতের মতো দেশগুলোতে ২০২৩ সালের পর ঋণের সুদহার ওঠানামা করছে ২–৭.৫ শতাংশে। বহু দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকলেও ঋণের সুদ শুরুতে বাড়িয়ে দ্রুত কমানো হয়েছে, এবং এতে অর্থনীতিতে কাজও হয়েছে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সাল থেকে নীতি সুদ ১০ শতাংশে স্থির রাখার কারণে ব্যাংকের ঋণের সুদ বেড়ে ১৬ শতাংশ বা তারও বেশি হয়েছে। ফলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন সরকার এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরিতে সুদহারের শিথিলতা বা যৌক্তিকীকরণের উপায় খুঁজছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেছেন, ১৫ শতাংশ রিটার্নে ব্যবসা করতে গেলে একই পরিমাণ সুদ দিতে হলে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকা কঠিন।
তাছাড়া, তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো কম সুদে আমানত নিলে বিনিয়োগকারীরা সরে যেতে পারে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ওপর ন্যূনতম ১ শতাংশ করের বোঝা অনেক ক্ষেত্রেই টিকে থাকার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি দেশের বড় প্রতিষ্ঠানও ১ শতাংশ নিট মুনাফা অর্জন করতে পারে না।
অর্থনীতির কিছু সূচক ভালো থাকলেও মূল্যস্ফীতি পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী। খেলাপি ঋণ ও তার পরিণতি সরকারকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করতে পারে। বাংলাদেশের বৃহৎ ঋণ পুনর্গঠন কমিটিতে কাজের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অনেক ব্যবসায়ী ঋণের বড় অংশ অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন। দুর্বল ব্যবস্থাপনা, ক্ষতি বা অনিয়মের কারণে ব্যাংকের নতুন ঋণ সক্ষমতা কমে গেছে। ফলে শুধু সুদহার কমিয়ে তারল্য বৃদ্ধি সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই বিনিয়োগ ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, কাঠামোগত সংস্কার ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, এই ধরনের উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। তবে বাংলাদেশে নতুন উদ্যোগ নিতে প্রায়ই সময় লাগে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে।
নতুন পরিস্থিতিতে বাজারের উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে নিয়মিত পদ্ধতি যথেষ্ট নয়। ব্যাংকিং খাতের অপরিপক্বতা ও অংশগ্রহণকারীদের জবাবদিহিতার অভাব মোকাবিলা করতে হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে বাজার সংস্কার কার্যকর হবে না।

