বিশ্ব মানচিত্রে একটি সরু জলপথ, কিন্তু তার গুরুত্ব অপরিসীম—এটাই হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে যুক্ত করা এই প্রণালী আজ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার এক কেন্দ্রবিন্দু।
মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রধান পথ হিসেবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বিশ্ববাজারে পৌঁছে।
বলা হয়, বিশ্বের মোট সামুদ্রিক জ্বালানি পরিবহনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়েই অতিক্রম করে। ফলে, এই প্রণালীর নিরাপত্তা মানেই বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা।
তবে এর গুরুত্ব শুধু আধুনিক সময়ে নয়—ঐতিহাসিকভাবেও এটি ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ১০ম থেকে ১৭শ শতাব্দীর মধ্যে চীন, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে রেশম, সিরামিক, হাতির দাঁত ও বস্ত্রের আদান-প্রদান এই পথেই হতো।
কৌশলগত দিক থেকেও হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত সংবেদনশীল। এটি পারস্য উপসাগরের একমাত্র প্রবেশদ্বার—একটি গুরুত্বপূর্ণ “চোকপয়েন্ট”। বিশ্বের বড় বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ যেমন সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এই পথের ওপর নির্ভরশীল।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান। প্রণালীর উত্তর উপকূলে অবস্থান করার কারণে ইরান এই জলপথের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে পারে।ফলে, এই অঞ্চলটি বহুবার আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে।
মাত্র প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সংকীর্ণ জলপথ সুপারট্যাঙ্কার চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালী শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়—এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক শক্তি।
- কাজী মাহমুদুর রহমান: চিফ লিগ্যাল অফিসার ও হেড অব লিগ্যাল ডিভিশন, ইউনিওন ব্যাংক।

