ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে প্রবেশ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও এই পুরো প্রকল্পের বিষয়ে তাদের মতবিরোধ প্রকাশ্যে জানাচ্ছে।
ফলে ফেব্রুয়ারিতে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত সম্পর্কিত আরো বিস্তারিত তথ্য সামনে আসছে। মাস্কাট ও জেনেভায় ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্পর্ক যখন আগেও ছিল তেমনই, আজও রয়েছে।
যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলছেন—যা ইরানের সংসদীয় স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ “ভুয়া খবর” হিসেবে নাকচ করেছেন—ফ্লাইট ডেটা থেকে দেখা যায়, তিনি একই সময়ে ইসরায়েল ও জর্ডানে বিপুল সংখ্যক মার্কিন সৈন্য স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। এটি দৃশ্যত একটি স্থল হামলা এবং যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ের প্রস্তুতির অংশ।
এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার ইরানে হামলার সিদ্ধান্তের মূল উপাদান এসেছিল একটি গোয়েন্দা ব্রিফিং থেকে, যা পরে শতভাগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। যে সন্দেহজনক ডসিয়ারটির কারণে এই হামলা হয়েছিল, সেটি লিখেছিলেন মোসাদের পরিচালক ডেভিড বারনিয়া।
বারনিয়ার এক ব্রিফিংয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে দাবি করা হয় যে, ইরানে মোসাদ স্থলভাগে এতটাই শক্তিশালী যে, একবার বিমান যুদ্ধ শুরু হলে তারা ইরানি বিরোধী শক্তিগুলোকে সরকার উৎখাতের জন্য সংগঠিত করতে সক্ষম হবে।
বারনিয়ার আত্মবিশ্বাস অনুযায়ী, যদি প্রয়োজন হয়, তেহরানে জানুয়ারিতে মুদ্রা ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভকে সশস্ত্র বিদ্রোহে পরিণত করার পেছনে মোসাদের বড় ভূমিকা ছিল। সেই বিদ্রোহে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছিলেন।
ট্রাম্পের কাছে নেতানিয়াহুর যুক্তি ছিল যে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র এতটাই দুর্বল যে একটি শেষ ধাক্কাই যথেষ্ট। যদিও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা বারনিয়ার ভবিষ্যদ্বাণীকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, তা সরল বিশ্বাসী ট্রাম্পকে প্রভাবিত করেছিল।
প্রথম বিমান হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিশ্চিহ্ন হন, তাঁর পুত্র মোজতবা গুরুতর আহত হন এবং ৪০-এরও বেশি শীর্ষ জেনারেল নিহত হন। হামলার এক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান পাল্টা হামলা শুরু করে, যা থেমে যায়নি।
অসম যুদ্ধ
ইরান ইসরায়েল, মার্কিন ঘাঁটি, তেল ট্যাঙ্কার এবং তেল ও গ্যাস শোধনাগারে হামলা চালানো এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে, যার ফলে বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ অচল হয়ে পড়েছে।
চতুর্থ সপ্তাহেও ইরান অবিরাম ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সরবরাহ বজায় রাখতে সমান সক্ষম। বিমান হামলায় ইরান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—নৌবাহিনী, বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর কমান্ড কেন্দ্র, বিমান বাহিনী ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ হারিয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ইরান আত্মরক্ষা অব্যাহত রেখেছে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এখন আঞ্চলিক যুদ্ধে পড়েছেন, যা শেষ করা তাদের জন্য কঠিন। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা অনুমান করছেন, ২০০০-এর দশকে বুশের আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমণের ফলে প্রায় ৪৭ লক্ষ মানুষ মৃত্যু বরণ করেছেন। ইরানের ওপর যুদ্ধের পরিণতি আরও ব্যাপক হতে পারে, বিশেষ করে এটি স্থল অভিযান হিসেবে চললে।
মোহাম্মদ এলবারাদেই, যিনি টানা তিনবার আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএএইএ)-র প্রধান ছিলেন, বলেন যে ইরাকের ক্ষেত্রে সিআইএ এবং এমআই৬ সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নথি তৈরি করেছিল। আজ ইরানের পরিস্থিতির সঙ্গে সাদৃশ্য চোখে পড়ছে।
এলবারাদেই বলেন, “হ্যান্স ব্লিক্স এবং আমি এক অত্যন্ত কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলাম। আমরা কোনো পারমাণবিক, রাসায়নিক বা জৈব অস্ত্র প্রোগ্রাম দেখিনি। অথচ বুশ প্রশাসন নিরাপত্তা পরিষদে জাঁকজমকপূর্ণ ব্রিফিং চালিয়েছিল।”
তিনি আরো বলেন, “এবারও ট্রাম্প একইভাবে কাজ করছে। নিরীহ বেসামরিক মানুষ মারা যাবে।”
আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা
এলবারাদেই আইএইএ-র বর্তমান মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসিকেও সমর্থন করেন, যিনি বলেছিলেন যে ইরান কয়েক মাসের মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করতে পারে।
এতে ট্রাম্পের বক্তব্যের বিরোধিতা হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে ‘ধ্বংস করা হয়েছে’।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, “গ্রোসি বলেছেন কোনো কাঠামোগত বা পরিকল্পিত অস্ত্র কর্মসূচি নেই। আইএইএ তার নিরপেক্ষতা হারাচ্ছে না; বরং নিরাপত্তা পরিষদ পুরোপুরি অচল।”
এলবারাদেই ইরানের সাবেক নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানিকেও চিনতেন। লারিজানি এই মাসে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন।
গাজার ঘটনায় এবং তারও আগে, আলোচক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক ও সাংবাদিকদের গুপ্তহত্যা যুদ্ধের একটি অংশ হয়ে উঠেছে। গণহত্যা আধুনিক যুদ্ধের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
পাশবিক শক্তির উচ্চাকাঙ্ক্ষা
পাশবিক শক্তির দ্বারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু রাষ্ট্রসমূহ ভাঙতে চায় না, বরং পুরো অঞ্চলকে নতুনভাবে গড়তে চায়। এটি আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মকানুনও বিসর্জন দিয়েছে। এলবারাদেই বলেন, পশ্চিমারা এখন স্পষ্টভাবে “মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন, “গাজা, ইরান, ইউক্রেন—নিরাপত্তা পরিষদ কোথায়? সেখানে নেই।”
পরিশেষে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু উভয়ই সংকটে রয়েছেন। যখন তাদের শাসন শেষ হবে, তখন সবাইকে এর ফল ভোগ করতে হবে। ভবিষ্যতের শত্রুরা আমাদের ওপর একই নিয়ম প্রয়োগ করবে যা আমরা তাদের ওপর প্রয়োগ করেছি।
- ডেভিড হার্স্ট: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

