স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর তদারকি সংস্থার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার কমিশন গঠনের প্রচলন রয়েছে, যা প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন, উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
লক্ষ করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে একটি দ্বন্দ্বময় কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রশাসনিক জটিলতা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং আইনি অস্পষ্টতার কারণে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়। এ ধরনের সংকট নিরসনে একটি স্থায়ী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার কমিশন গঠনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিকেন্দ্রীকরণ এবং সেবার মান বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, যেমন—নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ, কানাডার নিউ ব্রান্সউইক প্রদেশ এবং ভারতের কেরালা রাজ্য তাদের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামোর আলোকে স্থানীয় সরকার কমিশন পরিচালনা করে থাকে। প্রতিটি দেশের স্থানীয় সরকার কমিশন তাদের অনন্য কাঠামো ও লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। কারো মূল লক্ষ্য প্রশাসনিক পুনর্গঠন, কারো উদ্দেশ্য বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা, আবার কেউ দুর্নীতি দমন ও নীতিনির্ধারণে কাজ করছে। বাংলাদেশের জন্য কেরালা ও নিউজিল্যান্ডের মডেল অনুসরণ করে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও বিকেন্দ্রীকৃত স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন করা হলে এটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনমুখী করতে সহায়তা করতে পারে। সুতরাং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য একটি কার্যকর স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি।
স্থানীয় সরকার কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা হিসেবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন ও উন্নয়নের জন্য সুপারিশ প্রদান করতে পারে। বর্তমান ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে কাজ করলেও তারা প্রায়ই আইনি অসঙ্গতি, প্রশাসনিক বাধা ও স্বচ্ছতার অভাবে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। ফলে স্থানীয় সরকারগুলোর সেবার মান বৃদ্ধি এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি স্থায়ী স্থানীয় সরকার কমিশন কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করতে পারবে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান, যা তাদের স্বায়ত্তশাসনকে বাধাগ্রস্ত করে। বিশেষ করে তহবিল বণ্টন, উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন এবং প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত থেকে যায়। এ অবস্থায় একটি স্বাধীন কমিশন গঠন হলে এটি স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর জন্য একটি ন্যায্য ও স্বচ্ছ অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করতে সহায়ক হবে।
স্থানীয় সরকার কমিশন শুধু অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবেই না, বরং এটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনি জটিলতা নিরসন এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতেও সহায়তা করতে পারে। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো, বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সরকার আইন ও বিধিবিধান পরিবর্তন করা হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অস্পষ্ট থেকে যায়। অনেক সময় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যা সমাধানের জন্য নির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। এক্ষেত্রে শক্তিশালী কমিশন স্থানীয় সরকার আইনগুলোর সমন্বয় সাধন ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
বলা বাহুল্য, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়াতে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন একটি অপরিহার্য বিষয়। বর্তমানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত। এ ঘাটতি পূরণে স্থানীয় সরকার কমিশন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বৃদ্ধি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে সহযোগিতা করতে পারে। বিশেষ করে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর , জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম সমন্বয় ও উন্নয়নে কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নিরপেক্ষ তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক মনোনীত কর্মকর্তারা স্থানীয় সরকার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলেও এতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা থেকে যায়। ফলে, সঠিকভাবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার কমিশন স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারবে।
একটি কার্যকর স্থানীয় সরকার কমিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়তা করবে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতায় পড়ে। এ ধরনের সমস্যা নিরসনে একটি স্থায়ী কমিশন গঠিত হলে এটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কেন্দ্রের সঙ্গে নীতিনির্ধারণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সমন্বয়কারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি। এটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে একমাত্র কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। কমিশন গঠনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা, আইনি সমন্বয়, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও জনগণের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তাই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে এবং স্বায়ত্তশাসনের পূর্ণতা আনতে বাংলাদেশে একটি স্থায়ী স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য কেরালা ও নিউজিল্যান্ডের মডেল অনুসরণ করে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও বিকেন্দ্রীকৃত স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যা স্থানীয় সরকারের ন্যায়পাল হিসেবে কাজ করবে। স্থানীয় সরকার ন্যায়পাল এমন একটি স্বাধীন কর্তৃপক্ষ, যা স্থানীয় সরকারের সেবা সম্পর্কিত অভিযোগগুলো তদন্ত করে। যদি কেউ মনে করেন যে স্থানীয় সরকার বা পরিষদের কোনো সিদ্ধান্ত বা কার্যক্রমের কারণে তিনি অবিচারের শিকার হয়েছেন, তাহলে তিনি স্থানীয় সরকার ন্যায়পালের কাছে অভিযোগ করতে পারেন।
ন্যায়পাল নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি পর্যালোচনা করে এবং অভিযোগ প্রমাণ হলে ক্ষমা প্রার্থনা, ক্ষতিপূরণ বা নীতিমালার পরিবর্তনের মতো পদক্ষেপের সুপারিশ করতে পারে। সাধারণত এটি সরাসরি সংশ্লিষ্ট পরিষদের সঙ্গে সমাধান করার চেষ্টা করার পরের পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশে সরাসরি স্থানীয় সরকার ন্যায়পালের মতো কোনো স্বতন্ত্র সংস্থা নেই। তবে সংবিধানের ৭৭নং অনুচ্ছেদে ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিশেষ করে দুর্নীতি সংক্রান্ত বিষয়ে এবং অন্যান্য বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে স্থানীয় পরিষদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যায়। ইংল্যান্ড ও ভারতের অভিজ্ঞতা আমরা অনুসরণ করতে পারি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করে এর অন্যান্য কার্যাবলির সঙ্গে ন্যায়পালের দায়িত্বও প্রদান করা যেতে পারে। এটি দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনমুখী করতে সহায়তা করবে। অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশগুলোর আলোকে একটি শক্তিশালী, কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় সরকার গঠনই হোক আমাদের অঙ্গীকার। আর এ অঙ্গীকার পূরণে একটি স্থায়ী কমিশনের বিকল্প নেই।
আবদুর রহমান: অ্যাডভোকেট, আপিল বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; সদস্য, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ও সাবেক এডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট।
ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; ভিজিটিং প্রফেসর, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও হার্ভার্ড এবং সদস্য, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন।

