ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশার ঘনত্ব এই মুহূর্তে সারাদেশে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার উপযোগী মাত্রায় রয়েছে। তাই চলতি মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন এক নীরব আতঙ্ক।
কয়েক বছর ধরে এ রোগটি মৌসুমি সীমাবদ্ধতা ভেঙে সারাবছরেই দেখা দিচ্ছে। তবে বর্ষা এবং বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এর বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ে।
তথ্য-উপাত্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে, যদি এখনই মশক নিধনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, এ মাসে এডিস মশার ঘনত্ব চূড়ায় পৌঁছাবে। উচ্চ ঘনত্ব মানে রোগ সংক্রমণের হার আরও দ্রুত বাড়া এবং রোগীর সংখ্যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দ্বিগুণ বা ততোধিক হওয়া।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২৭ সেপ্টেম্বর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৪৫ হাজার ২০৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছে ১৮৮ জন। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই আক্রান্ত হয়েছে ১৩ হাজার ৭৩০ জন। এই সংখ্যা আগস্টের তুলনায় বেশি। প্রবণতা বলছে, যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে চলতি মাসে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
ডেঙ্গুর তথ্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, রাজধানী ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় সর্বাধিক রোগী শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে ডেঙ্গু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। গ্রামের মানুষও এখন আর নিরাপদ নেই।
তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, আক্রান্ত রোগীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নগর এলাকায় বসবাসকারী। ধীরে ধীরে গ্রাম এলাকায়ও সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ প্রবণতা আগামী দিনে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুহার তরুণ, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে সর্বাধিক। ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ এবং মৃত্যুও তুলনামূলক বেশি। এর অর্থ দাঁড়ায়, দেশের সক্রিয় কর্মশক্তি ও শিক্ষার্থী শ্রেণিই সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে আছে। এটি একদিকে পরিবারে গভীর শোক বয়ে আনছে, অন্যদিকে জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি বাড়ছে এবং পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
ডেঙ্গুর বিস্তার ও তীব্রতা বোঝার জন্য শুধু রোগীর সংখ্যা নয়, মশার ঘনত্ব সম্পর্কিত তথ্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় এডিস মশার ঘনত্বের যে তথ্য উঠে এসেছে, তা পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে। এডিস মশার লার্ভাযুক্ত পানির পাত্রের হার বৃষ্টির কারণে অনেক বেড়ে গেছে। অর্থাৎ ঘরের ভেতর ও বাইরে অসংখ্য ছোট ছোট পাত্র, টব, ড্রাম কিংবা অযত্নে ফেলে রাখা প্লাস্টিক সামগ্রীতে পানি জমে থেকে মশার জন্মস্থল তৈরি হচ্ছে। প্রতি কনটেইনারে এডিস লার্ভার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, প্রতি প্রজননস্থলেই মশার উৎপাদন হচ্ছে বহু গুণ, যা সরাসরি রোগের বিস্তারকে বাড়িয়ে তুলছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মূল কারণ-
প্রথমত, মশক নিধন কার্যক্রম এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। সিটি করপোরেশনগুলো কাগজ-কলমে কর্মসূচি নিলেও বাস্তবে তার কার্যকারিতা সীমিত। অনেক এলাকায় এখনও সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়োগ করা হয় না।
দ্বিতীয়ত, জনসচেতনতার ঘাটতি। অনেক পরিবার এখনও ডেঙ্গু প্রতিরোধে যথেষ্ট সতর্ক নয়। ফুলের টব, পানির কলস, বালতি, বহুতল ভবনের বিভিন্ন স্থান ও নির্মাণাধীন ভবনে জমা পানি, ড্রামের মতো জায়গায় সহজেই এডিস মশার প্রজনন হচ্ছে।
তৃতীয়ত, সমন্বয়হীনতা বড় সমস্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা-
সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন রোগীর চাপ বাড়ছে, কিন্তু শয্যাসংখ্যা সীমিত। অনেক হাসপাতালেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও সাপোর্ট স্টাফ নেই। এ ছাড়া সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত প্লাজমা বা প্লেটিলেট না পাওয়া গেলে রোগীর জীবন রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এই সীমাবদ্ধতা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে ছুটছে, যেখানে চিকিৎসা খরচ বহন করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় জরুরি প্রস্তুতি বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালে বাড়তি শয্যা, পর্যাপ্ত ওষুধ, রক্ত ও প্লেটিলেট সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে জটিল রোগীদের দ্রুত সেবা দেওয়া জরুরি। গ্রামীণ হাসপাতালেও ডেঙ্গু চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে রোগীদের রাজধানীতে ছুটতে না হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ডেঙ্গুকে শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হচ্ছে। এর মোকাবিলায় স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, পরিবেশ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, জনগণ– সবাইকে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণের বিকল্প নেই।
ডেঙ্গু স্বাস্থ্যঝুঁকিই তৈরি করছে না; অর্থনৈতিক ক্ষতির বোঝাও বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিবারের একজন সদস্য অসুস্থ হলে পুরো পরিবার আর্থিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিদিনের চিকিৎসা ব্যয়, ওষুধ, পরীক্ষার খরচ এবং কর্মক্ষম মানুষ কর্মহীন হওয়ায় উৎপাদনশীলতার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বৃহত্তর অর্থনীতিতে এর প্রভাব অনিবার্য।
করণীয় জানা, করতে হবে এখনই-
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রথমে মশক নিধন কার্যক্রমকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এটি কেবল সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব নয়; সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি সাধারণ মানুষকেও যুক্ত করতে হবে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি লার্ভিসাইড ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দেশে ইতোমধ্যে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। যেমন অটো-ডিসেমিনেশন ট্র্যাপ, জৈব নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং নতুন ধরনের লার্ভিসাইড। এসব দ্রুত মাঠ পর্যায়ে ব্যবহার করা জরুরি।
আরেকটি বড় করণীয় হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি। গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম, স্কুল-কলেজ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান– সবখান থেকেই মানুষকে সচেতন করতে হবে। প্রতিটি পরিবারকে বুঝতে হবে, এডিস মশার জন্মস্থল ধ্বংস করা ব্যক্তিগত দায়িত্বও বটে। সাপ্তাহিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা ছাড়া ডেঙ্গু মোকাবিলা সম্ভব নয়। সরকারকে এ ক্ষেত্রে আরও জোরাল প্রচারণা চালাতে হবে।
অতএব, এই অক্টোবরে সম্ভাব্য ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি এড়াতে হলে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দেরি হলে শুধু মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে।
- লেখক: অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার, কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ,
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সূত্র: সমকাল

