ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণ দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গণভোট ও জুলাই সনদসহ রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে জাতির উদ্দেশে তিনি যে সমাধান দিয়েছেন, তা নতুন দিক দেখিয়েছে। তার পর রাজনৈতিক দলগুলো মিছিল-মিটিংয়ে রাস্তায় নামেনি। ফলে জনগণ যেন এক দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে শান্তি পেয়েছে।
জাতীয় সমঝোতার নতুন আইডিয়া নিয়ে তিনি সবাইকে চমকে দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিবাদে সুযোগ নিয়ে মাঠ দখলের যে চেষ্টা চালানো হয়েছিল, তা ড. ইউনূসের কৌশলে ব্যর্থ হয়েছে। জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনাও তাৎক্ষণিকভাবে প্রশমিত হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫, দিনটি নানা কারণে ইতিহাসে থাকবে। এই দিনে গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায়ের তারিখ ঘোষণা করা হয়। ট্রাইব্যুনালে তার রায় জানানো হবে আগামী ১৭ নভেম্বর, সোমবার। ১৩ নভেম্বর হরতাল ডেকেছিল আওয়ামী লীগ ‘লকডাউন’-এর নামে। তবে রাজধানীবাসী তাকে পাত্তাই দেননি।
এদিন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই জাতীয় সনদ ও তার বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট সংক্রান্ত বিরোধের সমাধান দিয়ে জাতির সামনে অসাধারণ নজির স্থাপন করেছেন। বলা যায়, তিনি সত্যিই বাজিমাত করেছেন। পাশাপাশি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের বিষয়বস্তু উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, অনুমোদন গ্রহণ করা হয়েছে, এবং নিজে অনুমোদন দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে স্বাক্ষর করাতে বলেছেন। এর ফলে বৃহস্পতিবারই জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। এ আদেশের মাধ্যমে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি স্থাপন হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারের। এর মাধ্যমে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর অর্পিত তিনটি গুরুদায়িত্ব — সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন আয়োজন — তে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা দিয়েছে।
বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি কি পেল, কি হারালো:
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে একই দিনে দুই ভোটের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মধ্যে চলা বিরোধ সমাধান করেছেন। তিনি সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। শুধু তাই নয়, আদেশ জারি করে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এর আইনি ভিত্তিও স্থাপন করেছেন।
ড. ইউনূসের মূল চমক হলো—গণভোটে দেশবাসীর মতামত নেওয়া হবে মাত্র একটি প্রশ্নে ‘হ্যাঁ-না’ দিয়ে। প্রশ্নে চারটি বিষয় থাকলেও আলাদা আলাদা মতামতের সুযোগ থাকবে না। এটিই তার ইনোভেটিভ আইডিয়া। ইনোভেটিভ আইডিয়ার জন্য বিশ্বব্যাপী ড. ইউনূসের সুনাম রয়েছে। নোবেল পুরস্কারও মূলত এই ধরনের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই পেয়েছেন।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস স্পষ্ট করেছেন, গণভোটে মূল প্রশ্ন থাকবে একটি, আর ক, খ, গ, ঘ দিয়ে চারটি বিষয় আলাদাভাবে থাকবে। তবে উত্তর একটাই—‘হ্যাঁ’ বা ‘না’। বৃহস্পতিবার এই সিদ্ধান্তের কথা প্রধান উপদেষ্টা জাতির সামনে ঘোষণা করেছেন। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘জুলাই সনদের আলোকে আমরা গণভোটের ব্যালটে উপস্থাপনযোগ্য প্রশ্ন নির্ধারণ করেছি। আমি প্রশ্নটি এখন আপনাদের সামনে পাঠ করছি।
প্রশ্নটি হবে— “আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?”’
প্রস্তাবগুলো হলো—
ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ) আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন লাগবে।
গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ ৩০টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ ও জুলাই আদেশ জারির পর বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নিজেদের ফোরামে জরুরি বৈঠকে বসেছে। তারা আলোচনা ও পর্যালোচনা করে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, একসঙ্গে দুই ভোট এবং গণভোটে উত্থাপনীয় বিষয়গুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক মতামত জানাবে। গত ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ স্বাক্ষরের পর ঐকমত্য কমিশন ২৮ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার কাছে সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তার রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর নতুন করে জট দেখা দেয়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বৃহস্পতিবারের ভাষণে বিএনপির জন্য খুশি হওয়ার মতো কিছু সিদ্ধান্ত এসেছে। বিএনপির অন্যতম দাবি ছিল সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একদিনে আয়োজন করা। সেটি ভাষণে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী উচ্চকক্ষে শতভাগ পিআর চেয়েছিল। সেটিও ড. ইউনূসের সিদ্ধান্তে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
স্বাক্ষরিত সনদে বিএনপির দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট জুলাই আদেশের প্রস্তাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল। ড. ইউনূস নোট অব ডিসেন্টকে ফিরিয়ে এনে গণভোটে আলাদাভাবে ‘ঘ’ উপধারায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। বিএনপি উচ্চকক্ষ গঠনে রাজি থাকলেও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন নিয়ে আপত্তি ছিল। ড. ইউনূস সেটি ‘খ’ উপধারায় গণভোটে পাঠিয়েছেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো একমত হলেও ‘র্যাংকড চয়েস’ নিয়ে বিএনপির আপত্তি থাকায় নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল। ড. ইউনূস বিষয়টি উপেক্ষা করে ‘ক’ উপধারায় সেটি গণভোটে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠিত হবে বলেও জানিয়েছে।
রাষ্ট্রপতিকে আদেশে স্বাক্ষর করানো বিএনপির জোর দাবি ছিল। জামায়াত ও এনসিপি চেয়েছিল, শুধুমাত্র প্রধান উপদেষ্টাই স্বাক্ষর করবেন। ড. ইউনূস উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদন, নিজের স্বাক্ষর এবং রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর নিয়ে গেজেট প্রকাশ করে সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করেছেন। ফলে কোনো ফাঁকফোকর রাখা হয়নি।
জামায়াতে ইসলামী চাইছিল উচ্চকক্ষে শতভাগ পিআর। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেটি ‘খ’ উপধারায় গণভোটে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। জুলাই সনদের আইনি বৈধতা নিশ্চিত করার দাবি ছিল জামায়াতের পক্ষ থেকে। প্রধান উপদেষ্টা তা মেনে আদেশ জারি করেছেন। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সদস্য নিয়োগে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট উপেক্ষা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জামায়াত ও এনসিপির মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে বিষয়গুলো গণভোটে পাঠানো হয়েছে। নোট অব ডিসেন্ট পুরোপুরি না রাখার পক্ষে জামায়াত শেষ পর্যায়ে জোরালো অবস্থান নিলেও ড. ইউনূস বাকি বিষয়গুলোতে নোট অব ডিসেন্ট রেখেছেন এবং বলেছেন, “(ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।”
এনসিপি ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি। সে পর্যন্ত তারা আলোচনায় সক্রিয় ছিল, কিন্তু স্বাক্ষরের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তাদের মূল দাবি ছিল, সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে এবং আইনি ভিত্তি নিশ্চিত হবে। ড. ইউনূস সর্বশেষ পদক্ষেপের মাধ্যমে সেই দাবি পূরণ করেছেন। নোট অব ডিসেন্ট বাদ দিয়ে মৌলিক বিষয়গুলো গণভোটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একদিনে করার সিদ্ধান্তে এনসিপির আপত্তি ছিল না। তবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের স্বাক্ষর না দেওয়ার দাবি এনসিপি করেছিল। ড. ইউনূস তা উপেক্ষা করে আদেশে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া:
বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার জরুরি বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ধন্যবাদ দিয়েছে। বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট করার সিদ্ধান্তও জানিয়েছেন। এজন্য আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় স্থায়ী কমিটি তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছে।”
ব্রিফিংয়ে আরও বলা হয়, সভায় গত ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ওপর জনগণের সম্মতি গ্রহণের জন্য গণভোট আয়োজন এবং যথাসময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এর আগে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংলাপে নেতৃত্বদানকারী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা ভাষণের মাধ্যমে নিজের স্বাক্ষর করা জুলাই সনদ লঙ্ঘন করেছেন। কারণ যে জাতীয় সনদে তিনি স্বাক্ষর করেছিলেন, তা তিনি রক্ষা করেননি এবং এ ভাষণের মাধ্যমে তা লঙ্ঘন করেছেন।”
জামায়াতে ইসলামের নায়েবে আমির, সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের সভাপতিত্বে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।
বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ পর্যালোচনা করেছেন। বৈঠকে বলা হয়েছে, একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আয়োজন জাতির কাছে সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য হয়নি এবং গণদাবি পূরণ হয়নি। বৈঠকে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনগণের প্রত্যাশা এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া দেশ ও জাতির কল্যাণ, ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠা এবং আগামীর বাংলাদেশকে শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য সর্বস্তরের জনগণের সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করা হয়েছে।
এর আগে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, একই দিনে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেওয়ার মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। তিনি বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা জনগণের অভিপ্রায় ও জনদাবি উপেক্ষা করে একই দিনে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিয়েছেন। এতে একটি সংকট তৈরি হবে। কারণ গণভোটের আগে ভোটারদের জানা দরকার, কোন সংস্কার হয়েছে এবং কী সংশোধনী আনা হয়েছে। তার পরই ভোট দেওয়ার জন্য মাইন্ডসেট তৈরি হবে। কিন্তু এখন তা না জেনে একই দিনে দুটি ভোট দিতে হবে।”
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, যে সংকট নিরসনে জামায়াতসহ ইসলামি দেশপ্রেমিক আট দল দাবি করেছিল, ভোট জাতীয় নির্বাচনের আগে নেওয়া হোক। এতে পরে আদালত বা আইনি ভিত্তি নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠবে না। কিন্তু সেই সংকট এখনও রয়ে গেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আদেশ, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে গণভোট এবং উচ্চকক্ষ গঠনের সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। তবে এনসিপি এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তারা জরুরি বৈঠকে বসেছে।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে হলে আমাদের সমস্যা নেই। তবে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আমরা আহ্বান জানাই, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করুন। তা না হলে একই দিনে ভোট আয়োজন হুমকির মুখে পড়বে।”
প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আদেশের কিছু বিষয়ে ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও এটাকে স্বাগত জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। বৃহস্পতিবার ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের পর এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক বিবৃতিতে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যকে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে মেনে নেওয়ার পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, “যার যা মত থাকুক না কেন, সরকার ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস সবদিক বিবেচনা করে একই দিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন, উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতিক ভোট অনুযায়ী আসন নির্ধারণ এবং গণভোটে একমত ও ভিন্নমত অন্তর্ভুক্ত করে ব্যালট তৈরি করে চূড়ান্ত কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। এটি এখন অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য সমাধান।” নেতৃদ্বয় আশা প্রকাশ করেন, বিএনপি ও জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক দল বিভক্তি এড়িয়ে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও আনন্দমুখর পরিবেশে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে এবং দেশকে স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক পথে পরিচালনায় সহায়তা করবে।
অন্যদিকে, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫ বাস্তবায়ন আদেশ জারির সিদ্ধান্ত ইতিবাচক এবং জনঅভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশ। এটি জনগণের কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের প্রত্যাশা পূরণে একধাপ অগ্রগতি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে করার ঘোষণা দিয়ে একই প্রশ্নের মধ্যে আলাদা চারটি অংশ রেখে গণভোটকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে।”
‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর গেজেট প্রকাশের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে নাগরিক সংগঠন নাগরিক কোয়ালিশন। তারা একই সঙ্গে গণভোট আয়োজনে দেশের সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি মনে করছে, ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ছাড়া এর পূর্ণ বাস্তবায়ন কঠিন হবে। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে সংগঠনের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর এই বক্তব্যে স্বাক্ষর করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মির্জা গালিব জানিয়েছেন, গণভোট জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একসঙ্গে হওয়ার কোনো সমস্যা নেই। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটের প্রশ্নটিকে চার ভাগে ভাগ করেছে। এর পেছনে একটি চিন্তাধারা কাজ করছে। কিছু বিষয়কে নন-নেগোশিয়েবল ধরে এক প্রশ্নের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্য বিষয়গুলো পরের সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন—উচ্চকক্ষে পিআর, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন গঠন। এগুলো নন-নেগোশিয়েবল, তাই গণভোটে এক প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া চতুর্থ প্রশ্নে বলা আছে, ‘জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।’”
ড. গালিব আরও বলেন, “বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নির্বাচনকে উৎসবমুখর করা। নির্বাচনে পুরো মনোযোগ দেওয়া। দেশের মানুষ ১৫ বছর কোনো ভোট দিতে পারেনি। ভোট দেওয়ার জন্য তারা উন্মুখ। দেশের মানুষ চায় সুন্দর নির্বাচন। সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনি লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করুক। এটি সবার প্রত্যাশা।”
হাসিনার সাজা ঘোষণার পথ আটকালো না:
জুলাই গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ১৭ নভেম্বর সোমবার। দেশবাসী অধীর আগ্রহে সেই দিনটির প্রতীক্ষা করছিল। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম তিন স্টেকহোল্ডার বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিও একই চাওয়া জানিয়েছিল—হাসিনার সর্বোচ্চ সাজা ফাঁসি হোক। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামও এই দাবিকে সমর্থন করেছেন।
আওয়ামী লীগ এই রায়ের তারিখকে কেন্দ্র করে অনলাইনে ‘লকডাউনের’ নামে চারদিনের হরতাল ঘোষণা করেছিল। শেষ দিন বৃহস্পতিবার ছিল সর্বাত্মক। তবে সারা দেশে হরতালের প্রভাব সীমিতই থেকে যায়। ডজনখানেক বাস ও একটি ট্রেনে আগুন দেওয়া ও কয়েকটি স্থানে যান চলাচলে বাধা দেওয়ার ঘটনা ছাড়া বড় কোনো কার্যক্রমে সফল হয়নি।
বরং রাজপথে ছিল হাসিনাবিরোধী জুলাইযোদ্ধা ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির দখল। বিক্ষুব্ধ জনতা বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও আগুন লাগানো হয়। হরতালের সময় বিভিন্ন স্থানে বোমা মারতে গিয়ে পুলিশের হাতে কমবেশি আওয়ামী লীগ কর্মীরা ধরা পড়েছেন। অগ্নিসন্ত্রাস চালিয়েও জুনিয়র কর্মকাণ্ডে ব্যর্থ আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে, যে জুলাই গণহত্যার দায় থেকে শেখ হাসিনার মুক্তি নেই।
লেখক : জাহেদ চৌধুরী: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, আমার দেশ

