ঢাকা শহর এখন এক ভূতাত্ত্বিক টাইম বোমার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বিস্ফোরণের সময় অজানা হলেও- এর অনিবার্যতা নিশ্চিত। দেশের ভূগর্ভের ফাটল রেখাগুলো বর্তমানে সক্রিয় এবং বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ভূমিকম্প বাংলাদেশে আঘাত হানতে পারে। এই ঝুঁকি নিছক একটি পূর্বাভাস নয়, বরং ভূ-বিজ্ঞান, অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং চরম জনঘনত্বের এক জটিল সমীকরণের ফল।
১. সক্রিয় প্লেটের সংযোগস্থল এবং শক্তি সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া-
ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় ভূকম্পন বলয়ে। ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং বার্মা—এই তিনটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে আমাদের অবস্থান। এই প্লেটগুলো স্থির নয়; ইন্ডিয়ান প্লেটটি প্রতি বছর প্রায় ছয় সেন্টিমিটার বেগে উত্তর-পূর্ব দিকে এবং ইউরেশীয় প্লেটটি বছরে প্রায় দুই সেন্টিমিটার বেগে উত্তর দিকে সঞ্চালিত হচ্ছে। প্লেটগুলোর এই অব্যাহত সঞ্চালন ও সংঘর্ষের কারণে ভূ-ফাটল লাইনগুলোতে ক্রমাগত বিপুল পরিমাণ স্থিতিস্থাপক শক্তি জমা হচ্ছে। যখন শিলার এই শক্তি ধারণক্ষমতা অতিক্রম করে যায়, তখন তা বিদ্যমান বা নতুন কোনো ফাটল দিয়ে প্রবল কম্পন আকারে বেরিয়ে আসে।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (বৃহত্তর সিলেট), উত্তর-পশ্চিমের রংপুর এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হলেও, দেশের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত ঢাকাও সমানভাবে হুমকির মুখে।
২. ঢাকার নিকটবর্তী ফাটল: মধুপুর এবং সিসমিক গ্যাপের বিপদ-
ঢাকা মহানগরীর জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও গুরুতর হুমকি হলো মধুপুর ফল্ট বা চ্যুতি রেখা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ফল্টটি রাজধানী ঢাকার জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারণ এর অবস্থান রাজধানী থেকে অল্প দূরে। মধুপুর ফল্টটি উত্তর-দক্ষিণ বরাবর প্রায় একশ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এটি জামালপুর থেকে শুরু হয়ে ঢাকা নগরীর পশ্চিম পাশ ঘেঁষে কেরানীগঞ্জে শেষ হয়েছে।
দেশের অন্যতম ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরীর বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীর সবচেয়ে কাছে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হতে পারে এই মধুপুর ফল্ট। যদি সেখানে সর্বোচ্চ সাড়ে সাত মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তবে ঢাকা মহানগরে তার তীব্রতা সাত মাত্রায় পৌঁছাবে। এই মাত্রার ভূকম্পনে অনেক ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা ধসে পড়ার চরম আশঙ্কা রয়েছে।
এর পাশাপাশি, আরও দুটি প্রধান চ্যুতিরেখা—শিলং মালভূমির দক্ষিণ পাদদেশে অবস্থিত প্রায় তিনশ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাউকি ফল্ট এবং উপকূল বরাবর বিস্তৃত সিতাকুণ্ড-টেকনাফ ফল্ট—দেশের বড় তিনটি শহর, যার মধ্যে ঢাকাও রয়েছে, সেগুলোর ওপর অধিক ঝুঁকিপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রধান ফল্টগুলোতে কোনো বড় ধরনের ভূমিকম্প না হওয়ায় ‘সিসমিক গ্যাপ’-এর সৃষ্টি হয়েছে। এই সিসমিক গ্যাপ মূলত একটি অশনি সংকেত, যা ইঙ্গিত করে যে যেকোনো সময় এই সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ করে রিখটার স্কেলে সাত মাত্রার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে মুক্তি পেতে পারে। এমনকি এই ধরনের শক্তিশালী ভূমিকম্প বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানে ভূমিধস ঘটিয়ে সুনামীরও সৃষ্টি করতে পারে।
ভূমিকম্পের ঝুঁকির এই চিত্রটি দ্বৈত ভূতাত্ত্বিক ফাঁদকে নির্দেশ করে। ঢাকা শুধু নিকটবর্তী মধুপুর ফল্টের স্থানীয় ঝুঁকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বাইরে বা দূরে, যেমন মিয়ানমারের হোমালিন এলাকায় পাঁচ মাত্রার কম্পনও ঢাকার মানুষ টের পায়। ৬১৮ কিলোমিটার দূরবর্তী ভূমিকম্পেও বাংলাদেশে ভালোই ঝাঁকুনি অনুভূত হওয়ার নজির রয়েছে।
এর থেকে বোঝা যায় যে, ইন্ডিয়ান প্লেটের সঞ্চালনের কারণে দূরের ডাউকি ফল্ট বা সিতাকুণ্ড-টেকনাফ ফল্টে যদি সাত বা আট মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটে, তবে সেই কম্পন তরঙ্গ দুর্বল মাটির ওপর গড়ে ওঠা ঢাকাকে তীব্রভাবে ঝাঁকুনি দেবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে ঘন ঘন মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়া এই অঞ্চলের ভূ-ফাটল লাইনগুলোকে নাজুক ও শিথিল করে তুলছে, যা সম্ভাব্য শক্তিশালী ভূমিকম্পের আগে একটি আগাম সংকেত বা ‘ওয়েক আপ কল’ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
৩. অপরিকল্পিত কংক্রিটের মিনার: দুর্বল অবকাঠামো ও মাটির অভিশাপ-
ভূমিকম্পের তীব্রতা যা-ই হোক না কেন, ঢাকা শহরের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং মাটির অস্বাভাবিক চরিত্র এই বিপর্যয়ের মাত্রা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই মহানগরীর নির্মাণশৈলীতে নিয়মনীতির প্রতি চরম উদাসীনতা এবং ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থার ভয়াবহতা মিলেমিশে ঢাকাকে বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্প-প্রবণ এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহরের একটিতে পরিণত করেছে।
৩.১. বিল্ডিং কোড লঙ্ঘনের মহোৎসব এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা-
বিশেষজ্ঞদের সর্বসম্মত মতামত হলো, ঢাকায় ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো অপরিকল্পিত ও দুর্বল ভবন নির্মাণ, যেখানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়নি। রাজউকের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বহুতল ভবন তৈরি করা হচ্ছে এবং এই কারণে নগরবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে নগরবাসী কার্যত ‘টাইম বোমার ওপর বসবাস করছে’।
ঢাকার স্থাপত্যগত নৈরাজ্য উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানে প্রকাশ পেয়েছে। রাজউকের আওতায় ঢাকা মহানগরীতে মোট ২১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে একটি সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় বিশেষজ্ঞরা জানান যে ঢাকায় প্রায় ২১ লাখ ৪৬ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) এক জরিপে আরও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া যায়: রাজধানী ঢাকায় তিন লাখ ২৬ হাজার ভবনের মধ্যে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রায় ৭৮ হাজার ভবন অপরিকল্পিত, ভূমিকম্প প্রতিরোধক কারিগরি ব্যবস্থাবিহীন এবং নির্মাণে গুরুতর ত্রুটিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত।
এই নির্মাণে নৈরাজ্যের মূল কারণ হলো তদারকি সংস্থার দুর্বলতা। রাজউকের একজন প্রধান পরিকল্পনাবিদ নিজেই স্বীকার করেছেন যে এত বিপুল সংখ্যক নতুন ভবনের নির্মাণ নজরদারি করা অত্যন্ত কঠিন, যার ফলে বিল্ডিং কোড লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রায়শই পাওয়া যায়।
এই উদ্বেগজনক প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে নগর পরিকল্পনাবিদদের এই তথ্য যে, ঢাকার তেরো শতাংশ জায়গায় কোনো ধরনের ভবন বানানো উচিত নয়, কিন্তু সেখানেও ভবন তৈরি হচ্ছে, যা শহরকে বসবাস করার জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
৩.২. ডেল্টার মাটি: লিকুইফ্যাকশন বা তরলীভবন ঝুঁকি-
কাঠামোগত ত্রুটির পাশাপাশি, ঢাকা মহানগরীর ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থা দুর্যোগের ঝুঁকিকে আরও মারাত্মক করে তুলেছে। বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নরম ও জলাবদ্ধ পলিমাটির ওপর গড়ে উঠেছে। ঢাকা শহরের নতুন এলাকাগুলোতে মূলত নদী থেকে ড্রেজিং করা পলিমাটি দিয়ে নিচু জমি ভরাট করা হয়, যা সাধারণত আলগা প্রকৃতির পলিযুক্ত বালু। প্রবল ভূকম্পনের সময় এই নরম ও আলগা মাটি তার দৃঢ়তা হারিয়ে তরল পদার্থের মতো আচরণ করতে পারে, এই প্রক্রিয়াকে ‘লিকুইফ্যাকশন’ বা তরলীভবন বলা হয়।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, লিকুইফ্যাকশন ঢাকার জন্য একটি বড় বিপদ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গবেষণায় ঢাকা শহরের ভূতাত্ত্বিক এককগুলোর ভিত্তিতে তরলীভবন ঝুঁকি অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়েছে। এই গবেষণা অনুযায়ী, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জোনে (যা হোলোসিন পলিমাটি এবং কৃত্রিম ভরাট দ্বারা গঠিত) রিখটার স্কেলে ৭.০ মাত্রার ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে প্রায় চুয়াত্তর শতাংশ এলাকায় পৃষ্ঠতলে লিকুইফ্যাকশনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এটি ভবনের ভিতকে আলগা করে দেবে এবং মাটির ব্যর্থতার কারণে ধসের ঝুঁকি অনেক গুণ বাড়িয়ে দেবে।
বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে ‘ডাবল হোয়ামি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন: ঢাকার ভবনগুলো একদিকে অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং অন্যদিকে দুর্বল, লিকুইফ্যাকশন-প্রবণ মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ, কোনো ভবন যদি আপাতদৃষ্টিতে ভালো মানেরও হয়, তবুও ভূমিকম্পের তীব্র কম্পন এবং মাটির তরলীভবন—এই দুই দুর্যোগ একত্রে আঘাত হানলে ভিতের ব্যর্থতার কারণে তা ধসে পড়তে পারে। ফলে কাঠামোগত দুর্বলতা এবং মাটির দুর্বলতা মিলে বিপর্যয়কে চরম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
- ড. মোজাম্মেল হক (এমআইটি, বোস্টন, যুক্তরাষ্ট্র), ফেসবুক থেকে সংগৃহীত I

