একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ মূলত সংঘটিত হয়েছে দেশের গ্রামে গ্রামে। এ যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ। তাদের পালিয়ে থাকতে হয়েছে। কেননা বাড়িতে নিরাপত্তার অভাব ছিল।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ মূলত সংঘটিত হয়েছে দেশের গ্রামে গ্রামে। এ যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ। তাদের পালিয়ে থাকতে হয়েছে। কেননা বাড়িতে নিরাপত্তার অভাব ছিল। যে কারণে সেসময় দেশের কৃষকরা ঠিকমতো কৃষি বা অন্য কাজও করতে পারেননি। ফলে তারা অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের গ্রামের মানুষের অবস্থা বেশ খারাপ ছিল।
সে সময় গ্রামগুলো জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে। এর কারণ বেশির ভাগ গ্রামে শান্তি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। যদিও সব শান্তি কমিটি খারাপ ছিল না। কিন্তু এ কমিটি থাকার অর্থই ছিল কোনো না কোনো উপায়ে গ্রামীণ মানুষ নির্যাতন-অত্যাচারের শিকার হবে। এ রকম পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই কৃষকের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। তারা মাঠে যেতেই ভয় পেতেন। তাদের ভয় ছিল হঠাৎ করেই তাদের তুলে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হবে। সেসময় কৃষিতে নারীদের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। যেসব নারী কৃষির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের মধ্যে আরো বেশি ভীতি কাজ করত। তারা ঘরের বাইরে যেতে ভয় পেতেন।
অন্যদিকে গ্রামের বিদ্যালয়গুলোও সব বন্ধ থাকত। শিশুরা স্কুলে যেত না। বিভিন্ন উৎসবেও কেউ ঘর থেকে বের হতো না। মুক্তিযুদ্ধকালীন গ্রামের বড় জনগোষ্ঠী ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ। তাদের মধ্যে অবস্থাপন্ন অংশ কৃষকদের পুঁজি দিতেন। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালে তারা পুঁজি দিতে পারেননি। তারা ব্যাপকভাবে লুটের শিকার হয়েছেন বা প্রাণ বাঁচাতে ভারতে অভিবাসন করেছেন। ফলে গ্রামীণ কৃষির পুরো কাঠামো দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। এ কাঠামো নিয়ে দেশে গবেষণা কম হয়।
দেশের জনগণের অধিকাংশের কাছে মুক্তিযুদ্ধ হলো গোলাগুলির একাত্তর। কিন্তু এতে জনজীবন কতটা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল তা নিয়ে অতটা ভাবনা বা গবেষণার অবকাশ রয়ে গেছে। আমরা দেশের গবেষণার সীমাবদ্ধতা হলো আমরা ইতিহাস চর্চা করতে গেলে রাষ্ট্রের ইতিহাস দেখি। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজনৈতিক কী কী ঘটনা ঘটেছিল, সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী ছিল, মুজিবনগর সরকার কী করেছিল এগুলোকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে কী ঘটেছিল তা নিয়ে খুব কম কাজ হয়। যদিও স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পের অংশ হিসেবে আমরা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি কাজ করেছি।
গ্রামগুলো নিয়ে ১৯৮৫ সাল থেকে কাজ করছি এবং ২০১৮ সালে ২ হাজার ৩০০ গ্রামের ওপর কাজ করেছি। গ্রামের যে চিত্র আমরা দেখেছি তা ‘গ্রামের একাত্তর’, ‘নারীদের একাত্তর’ ও ‘হিন্দু জনগোষ্ঠীর একাত্তর’ বইয়ে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আমরা তৎকালীন গ্রামগুলোয় পণ্যের দাম নিয়ে গবেষণা করেছি। আমরা অনেকেই কল্পনাও করতে পারি না যে সেসময় লবণের তীব্র অভাব ছিল। এ সংকটের কারণ ছিল ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়। একেবারেই লবণহীন হয়ে পড়ে মানুষ। তারা নানাভাবে লবণ সংগ্রহের চেষ্টা করতেন। অনেক সময় খেজুর গাছের ডাল থেকে লবণ সংগ্রহের চেষ্টা করতেন। অনেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারত থেকে লবণ কিনে আনতেন। তারপর তা দেশে বিক্রি করে জীবন নির্বাহ করতেন।

এ রকম বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষকের সামাজিক কাঠামো। দীর্ঘদিন বিরতিহীনভাবে যে কৃষি কাঠামো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বজায় ছিল তা ১৯৭১ সালে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক জীবনযাপন বিঘ্নিত হয়েছিল। আর অস্বাভাবিক জীবনের সুদীর্ঘ প্রভাব পড়েছিল গ্রাম ও জনজীবনে। যেমন ১৯৭৩ সালের দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। আবার পরবর্তী সময়ে গ্রামের রাজনীতিতে একটা সুবিধাভোগী শ্রেণীও গড়ে উঠেছিল। এ সুবিধাভোগী শ্রেণীর একটা অংশ একসময় হয়তো পাকিস্তানিদের পক্ষে ছিল। পক্ষে থাকাকে পুঁজি করে তারা সুবিধাটা নিয়েছে। এভাবে গ্রামে বিস্তর পরিবর্তন ঘটেছে।
গ্রাম প্রসঙ্গে জেনারেল অরোরা আমাকে একবার বলেছিলেন, গ্রামের মানুষ যদি রাজি না হতো তাহলে বাংলাদেশে যৌথবাহিনী প্রবেশ করতে পারত না। সেসময় গ্রামের মানুষ ছিল সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠী। মূলত তারাই যুদ্ধটা টিকিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের বেশির ভাগ ছিলেন গ্রামের মানুষ। শহরের মুক্তিযোদ্ধা সংখ্যায় কম ছিলেন, হয়তো প্রতি ১০০ জনে ১০ জন। যদিও সেসময় শহরের সংখ্যাও ছিল হাতেগোনা। প্রশিক্ষণ নেয়া শত শত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ৯০ শতাংশই ছিলেন গ্রামীণ মানুষ। তারা হালচাষ করেছেন। তারাই যুদ্ধটাও করেছেন। কিন্তু কৃষকদের এ মৌলিক ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চায় আজও উপেক্ষিত।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কৃষকরা সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এছাড়া গ্রামগুলোয় দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার ফলে কৃষকরা খুব ভয়ার্ত অবস্থায় ছিলেন। দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছিল। লুটপাটের ভয়ে কৃষকরা তুলনামূলক সস্তা দামে গরু বিক্রি করে দিতেন। আবার মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ায় সেসময় গ্রামে ডাকাতি বেড়ে গিয়েছিল। গ্রামের নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে পড়ায় মানুষের নিজেকে ডাকাতের হাত থেকে বাঁচানোর উপায় ছিল না। পুলিশরা পালিয়ে গিয়েছিল। ফলে গ্রামে গ্রামে অসংখ্য ডাকাত বাহিনী গড়ে ওঠে। কিন্তু এর মধ্যেও কৃষিকাজ পরিচালনা করা হয়েছে। অনেক জায়গায় আর্মি গিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছে। সব মিলিয়ে খুব অস্বাভাবিক জীবন যাপন করেছেন গ্রামীণ মানুষ, যাদের কথা দেশের ইতিহাসচর্চায় অনুপস্থিত।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অসংখ্য বই প্রকাশ পেয়েছে। সেসব বইয়ে নাগরিক জীবনের কথাই বেশি উঠে এসেছে। কিছু বইয়ে গ্রামের মানুষের জীবনী উঠে এলেও সেটি এক ভাগ। কিন্তু গ্রামের ৯৯ ভাগ মানুষের জীবনের কথা বইগুলোয় ঠাঁয় পায়নি। অথচ গ্রামীণ মানুষই বারবার মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর আক্রমণের পর শহরের মানুষ গ্রামমুখী হয়েছিলেন। গ্রামের মানুষ, কৃষকরা তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। আবার হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদেরও আশ্রয় দিয়েছেন কৃষক সমাজ। মুক্তিযোদ্ধারা যখন ট্রেনিং নিয়ে ফেরত এসেছেন, তাদেরও আশ্রয় দিয়েছেন কৃষকরা। কিন্তু কৃষকদের এ ভূমিকাও কোনো স্বীকৃতি পায়নি।
মুক্তিযোদ্ধা বলতে সশস্ত্র সংগ্রামকারীদের প্রতিচ্ছবিই ভেসে ওঠে সবার চোখে। কিন্তু যে যার মতো সেসময় যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। যেমন যুদ্ধ চলাকালে একটি গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গিয়েছে। সেখানে একটা বাড়িতে একটা হিন্দু পরিবারকে আশ্রয় দেয়া হয়েছিল। আর্মির প্রশ্নের মুখে হিন্দু পরিবারটিকে আত্মীয় হিসেবে পরিচয় করানো হয়। কিন্তু সেসময় একটি ছোট একটা শিশু ‘পিসি’ বসবেন না বলে ওঠে। পিসি শব্দটি শুনে হানাদার বাহিনী বুঝতে পারে যে তারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তারপর দুই পরিবারের ওপরই নির্যাতন চালানো হয়। অর্থাৎ গ্রামের মানুষ আশ্রয় দিয়েও বহু বিপদে পড়েছেন।
যদিও মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রে এসবের তেমন একটা উল্লেখ নেই। উল্লেখ নেই নারীদের সংগ্রামের কথা। সোহাগপুর গ্রামের তৎকালীন নারীদের জীবনের দিকে তাকালেই নারীদের সংগ্রাম স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধে সেখানে অসংখ্য নারী বিধবা হয়েছেন। জীবন চালনার তাগিদে তারা পরবর্তীতে শ্রমিক হয়েছেন, কৃষিকাজ করেছেন। আবার একজন ভাই যখন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন, তার বোনের অবস্থার খোঁজ কেউ রাখেনি। কিন্তু সেই বোন তথা নারী নিজেকে সামলানোর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও সামলেছেন। এমনকি কৃষিকাজও করেছেন। দুঃখজনকভাবে এগুলোও ইতিহাসের আলাপে সেভাবে আসেনি। হাতেগোনা কয়েকজন গবেষক এগুলো নিয়ে কাজ করেছেন। এর মধ্যে আমাদের গবেষণায় এসব ঘটনা উঠে এসেছে। আমার লেখা ‘বাংলাদেশ ১৯৭১’ নামক চার খণ্ডের বইয়ে এসব ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম ভূমিকা ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর। তারা সহযোদ্ধা হিসেবে এসেছিল। আগেও উল্লেখ করেছি যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে কৃষকরা যদি তাদের এ দেশে প্রবেশ করতে না দিতেন, তাহলে তারা আসতে পারতেন না। অর্থাৎ ভারতীয় সেনাবাহিনী স্বীকৃতি দিলেও দেশে এ কথার স্বীকৃতি নেই, সেই ইতিহাসচর্চা নেই।
এ কারণেই বলা হয়, ক্ষমতাবানরা ইতিহাস লেখে। আর তাতে ক্ষমতাবানরা নিজেদের কথাই লেখে। সেজন্য আমি মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের চর্চা যদি করতেই হয়, যারা এখনো জীবিত আছেন তাদের অবদান সামনে আনা প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যতে আর সাক্ষী পাওয়া যাবে। এরই মধ্যে তো বেশির ভাগ যোদ্ধা, তাদের পরিবারের সদস্যরা মারা গেছেন। তাই জীবিতদের ইতিহাস জানতে হবে। হয়তো তাদের স্মৃতি থেকে এখনো অনেক কিছু জানা সম্ভব। কিন্তু এটা যদি না করা হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের বড় অংশীজন, কৃষকের ইতিহাস জানা হবে না। অসম্পূর্ণ, সীমিত একটা ইতিহাসকে গোটা দেশের ইতিহাস বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হবে।
গবেষণাকালীন আমি অনেকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে মুক্তিযুদ্ধে কেন গিয়েছিলেন। তাদের অনেকেই গিয়েছিলেন প্রতিশোধ নিতে বা তাদের মেয়েকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে সেই ভয় থেকে। এসব ইতিহাস জানা প্রয়োজন। আমাদের জানতে হবে গ্রামের রাজনীতি ও কৃষক সমাজ কীভাবে সেসময় বড় ভূমিকা রেখেছিল। এসব আলাপ এখনো উপেক্ষিত। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে কৃষক সমাজকে সম্পূর্ণরূপে বাদ দেয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে রাষ্ট্রের ইতিহাস আসে, কিন্তু সমাজের ইতিহাস বলা হয় না। যে কারণে কৃষকের ইতিহাসের কথা আসে না। ইতিহাসচর্চা হতে হবে তথ্যের ভিত্তিতে। রাজনীতি আর আবেগভিত্তিক ইতিহাস কখনই প্রকৃত ইতিহাস হয় না।
আফসান চৌধুরী: অধ্যাপক ও গবেষক।
সূত্র:বণিক বার্তা

