২০২৫ সালের শেষ কয়েক সপ্তাহে সংবাদমাধ্যমে যে কোলাহল ও দম্ভের ছাপ ছিল, তার আড়ালে একটি বক্তব্য পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। গত মাসে ইসলামাবাদে একটি ব্যবসায়িক অনুষ্ঠানে এসআইএফসি’র জাতীয় সমন্বয়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল সরফরাজ আহমেদ বলেন, পাকিস্তানের কোনো প্রবৃদ্ধি পরিকল্পনা নেই; পাশাপাশি তিনি যোগ করেন, পাকিস্তান তার রাজস্ব পরিস্থিতি পুরোপুরি এলোমেলো করে ফেলেছে।
তিনি বলেন, সরকার কেবল কর বাড়ানোর কথাই ভাবতে পারে এবং ইঙ্গিত দেন, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় সহজ লক্ষ্যবস্তু কারণ তারা ইতোমধ্যেই করজালের ভেতরে রয়েছে। তাঁর মতে, উচ্চ কর অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—দু’ধরনের বিনিয়োগই নিরুৎসাহিত করে। কর কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন বলে জানা যায়, ‘ব্যবসা-যেমন-চলছে’ ধরনের পদ্ধতিতে কাজ হবে না। একই সুরে আরো বক্তব্য দেওয়া হয়, যা অনুরূপ ব্যবসা-সম্পর্কিত অনুষ্ঠানের বক্তৃতার চেয়ে বেশি মনোযোগ কাড়ে। অনেকের কাছে এটি অর্থনীতি খুব ভালো অবস্থায় নেই এবং তা টেকসইও নয়—এমন এক স্বীকারোক্তি হিসেবে ধরা পড়ে।
এই দেশের চিরন্তন বেসামরিক–সামরিক নৃত্যের প্রেক্ষাপটে ফিসফিস করে যে প্রশ্নটি ঘুরে ফিরে আসছিল তা হলো—এটি কি সরকারকেই সমালোচনা করা? শেষ পর্যন্ত- সরকারে থাকা বেসামরিক নেতৃত্ব, প্রধানমন্ত্রীসহ অর্থনীতি স্থিতিশীল ও উন্নত করার সাফল্যের কথা দাবি করে থামছেন না। অনুষ্ঠানের প্রায় দুই সপ্তাহ পর, একটি সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বলেন অর্থনীতি বিপদমুক্ত এবং বড় সূচকগুলো চমৎকার।
কিন্তু ইসলামাবাদের গুঞ্জন যদি বিশ্বাসযোগ্য হয়, তাহলে অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগগুলো বাস্তব। সম্ভবত ঠিক ততটাই বাস্তব, যতটা বাস্তব ২৮তম সংশোধনী ও এনএফসি পুনর্বিন্যাস নিয়ে আলোচনা। বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারির বক্তব্য এই ধারণাকে আরো জোরালো করে, যেখানে তিনি তাঁর মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে দেওয়া ভাষণে ফেডারেল সরকারের আর্থিক বোঝা ভাগাভাগি করার প্রস্তাব দেন। একে কেউ কেউ সরকারের প্রতি এবং অন্যদের প্রতিও একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
বেশির ভাগের মতেই ক্ষমতাসীনরা সাধারণ মানুষের জন্য অর্থনৈতিক স্বস্তি দিতে চাপের মধ্যে আছেন—কর ও বিদ্যুৎ বিল কমানো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে। এটি প্রয়োজনীয়, কারণ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন না থাকলে বৈধতা অর্জনের আর কোনো পথ নেই।
বাস্তবে- পিটিআইয়ের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বিরোধীদের সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাবও বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীনরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারা খুব বেশি কিছু অর্জন করতে পারেননি বলেই বিরোধীদের সঙ্গে কথা বলার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। বিরোধীদের মধ্যেও কেউ কেউ বিষয়টিকে সেভাবেই দেখছেন, যদিও তাদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়।
যদি ইসলামাবাদের গুঞ্জন বিশ্বাসযোগ্য হয়, তাহলে অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগগুলো বাস্তব।
এই সব বক্তব্য ও সংলাপের প্রস্তাবের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাম্প্রতিক সাংবিধানিক সংশোধনীগুলো এখন ক্ষমতাকে কয়েকটি হাতে কেন্দ্রীভূত করেছে এবং বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম ও বিরোধীদের যেকোনো চ্যালেঞ্জ বলপ্রয়োগ ও তড়িঘড়ি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সফলভাবে দমন করা হয়েছে। এসব কিছুই জনগণ বা তাদের কল্যাণের তোয়াক্কা না করেই করা হয়েছে। ফলে এখন আর কিছু না দেওয়ার কোনো কারণ নেই: সাধারণ মানুষের জন্য অর্থনৈতিক স্বস্তি দেওয়া ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এ ধারণাকে আরো শক্তিশালী করে এমন ‘প্রতিবেদন’, যেখানে বলা হচ্ছে অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা ও উন্নতির পথ খোঁজার জন্য সরকারের ‘দুই পক্ষ’ বৈঠকে বসেছে।
আসলে এসআইএফসি’র ওই কর্মকর্তা বলেছেন বলে জানা যায়, সরকারের ভেতরে কর কমাতে হবে—এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে। ধরে নেওয়া যায়, এই ঐকমত্য কিছু বৈঠকে, আড়ালে তৈরি হয়েছে। কিন্তু সরকারের বাইরে খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেন, এটি বাস্তবে ঘটতে পারে। অর্থনৈতিক বিষয়ে পারদর্শীরা মনে করিয়ে দেন, সরকার এখনো কোনো সংস্কার বাস্তবায়ন করেনি। এখানেই ইসলামাবাদের খেলাগুলো সম্পর্কে অভিজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, স্থবির অর্থনীতির দায় চাপিয়ে সরকারকে বিদায় করে দেওয়া হতে পারে।
তাদের মতে, এই সরকার ব্যবস্থাটির জন্য কোনো জনপ্রিয় সমর্থন আনতে পারছে না এবং যদি অর্থনীতি উন্নত করতেও না পারে, তাহলে তাকে ক্ষমতায় রেখে লাভ কী? অন্তত বিদায় করলে অজনপ্রিয় মুখগুলো সরিয়ে কিছু ‘ব্রাউনি পয়েন্ট’ অর্জন করা যেতে পারে। তবে এটি একটি চরম পদক্ষেপ।
যদি একটি গণতান্ত্রিক আবরণ বজায় রাখতে হয়, তাহলে শাহবাজ শরিফের মতো সহনশীল ও উদার ব্যক্তি ও রাজনীতিক খুব কমই আছেন। তাঁর কট্টর সমালোচকরাও এটি অস্বীকার করতে পারবেন না; এমনকি যারা টেলিভিশনে বসে সরকার ও সংসদের অকার্যকারিতা নিয়ে অভিযোগ করেন তারাও না।
আরেকটি বিকল্প হতে পারে পুরো ব্যবস্থার বদলে মন্ত্রিসভায় কিছু পরিবর্তন। স্বাভাবিকভাবেই এর মানে, অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর দিকেই নজর যাবে। লক্ষণীয় যে, অর্থনৈতিক দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে ঘিরে ফিসফাস বাড়ছে। সরকারের অন্যদের থেকে তাঁর দূরত্ব নিয়ে গল্প নতুন নয়, তবে শব্দ এখন জোরালো হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়, সাম্প্রতিক একটি তুলনামূলকভাবে অজানা পডকাস্ট, যেখানে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এক ‘সাংবাদিক’ কয়েক মিনিট ধরে অর্থনীতি নিয়ে কথা বলেন এবং এই লেখায় উল্লিখিত কিছু বিষয়ও তোলেন। এরপর তিনি এক মন্ত্রিসভার সদস্যকে আলাদা করে চিহ্নিত করে তাঁর কর্মদক্ষতা ও কর্মঘণ্টায় আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। মন্তব্যগুলো অগোচরে যায়নি।
এখন প্রশ্ন উঠছে—এই মন্তব্যগুলো কি হঠাৎ রাগের বশে করা হয়েছিল, নাকি তিনি নিজের পতনের আভাস জানেন বলেই এমন বলেছেন। ওই সাক্ষাৎকারদাতা ভুল করার মতো অসতর্ক নন। এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা কঠিন, তবে অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদের কাউকে না কাউকে গ্রাস করবেই। এটা কেবল সময়ের ব্যাপার।
- লেখক–একজন সাংবাদিক। সূত্র: ‘দ্য ডন’য়ের ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত।

