কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অন্যতম প্রধান মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডলার সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবস্থা। যেকারণে আজও দ্রব্যমূল্যের বাজার অস্থিতিশীল, দেশে বিরাজ করছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, শিল্প উৎপাদন ও কাঁচামাল সংকট এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তির মায়াজাল।
এই সংকটের প্রধান কারণ হলো দীর্ঘকাল ধরেই আমাদের অর্থনীতি বিশালভাবে আমদানি নির্ভর। দেখা যায়, প্রতি বছর আমরা চাল, চিনি, ডালের পাশাপাশি বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করি তুলা, ভোজ্যতেল, জ্বালানি, ইলেকট্রনিকস পণ্য, প্লাস্টিকের কাঁচামাল এবং যন্ত্রপাতির পেছনে। আর বর্তমানে ডলারের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় আমদানিকৃত কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে। যার ফলে দেশীয় পণ্য উৎপাদন খরচও আগের তুলনায় বেড়ে গেছে। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ডলারের বিনিময় হারের অস্থিরতা প্রমাণ করেছে যে, এই অতি নির্ভরশীলতা যে কোনো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে দিতে পারে।। এই পরিস্থিতিতে আমদানি বিকল্প শিল্পায়নকে কাজে লাগিয়ে আমাদের অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিতে পারলে দেশের ডলার সংকট পরিস্থিতি অনেকাংশেই হ্রাস পাবে বলে আশা করা যায়।
আমদানি বিকল্প শিল্পায়ন বলতে বোঝায় যখন একটি দেশ অন্য দেশ থেকে পণ্য আমদানি করার পরিবর্তে সেই পণ্য নিজের দেশে উৎপাদন করে। দেশে এমন অনেক পণ্য আছে যা সামান্য সরকারি নীতি সহায়তা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ পেলে স্থানীয়ভাবেই সাশ্রয়ী মূল্যে উৎপাদন করা সম্ভব। যেমন- বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প, হালকা প্রকৌশল বা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং তথ্যপ্রযুক্তির যন্ত্রাংশ তৈরির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আমরা প্রতি বছর ৭৫-৮০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করি তুলা, ভোজ্যতেল, সার, প্লাস্টিক, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি আমদানিতে। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশ যদি হালকা প্রকৌশল ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে ১০-১৫ শতাংশ উৎপাদন বাড়াতে পারে তাহলে বছরে ৫-৭ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব।
কৃষির দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারি, বাংলাদেশ প্রায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশ। কিন্তু খাদ্য সংরক্ষণে এখনো আমরা অনেক পিছিয়ে। অথচ কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বৈশ্বিক বাজারমূল্য হলো ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, এ খাতে বাংলাদেশের অবস্থান ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে অবস্থান করছে। দেশে কৃষিজ পণ্য সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে প্রতি বছর প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ শাকসবজি ও ফলমূল নষ্ট হয়। যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। উত্তরবঙ্গের টমেটো বা দক্ষিণবঙ্গের নারিকেল যদি প্রক্রিয়াজাত করে সস বা দুধ হিসেবে বাজারজাত করা যেত, তবে একদিকে আমদানীকৃত খাদ্যের চাহিদা কমত, অন্যদিকে কৃষকরা পেতেন ন্যায্য মূল্য। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে। তাই এই শিল্পকে আমাদের আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এজন্য সরকার নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলগুলোতে কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আলাদা ‘এগ্রো-পার্ক’ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে থাকবে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সুবিধা।
তাছাড়া সব পণ্য সব জায়গায় না করে আঞ্চলিক কাঁচামালের প্রাপ্যতা অনুযায়ী কারখানা স্থাপন করতে হবে। যেমন- রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমরা ‘ম্যাঙ্গো পান্ধং’ ও ‘টমেটো পেস্ট’ তৈরির বড় কারখানা করতে পারি, যাতে অফ-সিজনেও এসব ফলের চাহিদা মেটানো যায়। রংপুর ও বগুড়ায় করতে পারি আলু থেকে স্টার্চ এবং পটেটো ফ্লেক্স তৈরির কারখানা। এই শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন মানসম্মত ও নিয়মিত কাঁচামাল। এর জন্য ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’ বা চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ জনপ্রিয় করতে হবে, যেখানে কোম্পানিগুলো সরাসরি কৃষকদের বীজ ও প্রশিক্ষণ দেবে এবং উৎপাদিত ফসল সরাসরি কিনবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে যাবে এবং কৃষক পাবে ন্যায্য মূল্য।
‘আমদানি বিকল্প শিল্পায়ন’ হিসেবে ‘হালকা প্রকৌশল’ বা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরটি আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে তৈরি পোশাক, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ ও কৃষি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সিংহভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। পরিসংখ্যান অনুসারে, প্রতি বছর আমরা কেবল এসব খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতেই কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করি।অথচ ইতোমধ্যে আমাদের ধোলাইখাল, বগুড়া বা যশোরের কারিগররা রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে এসব জটিল যন্ত্রাংশ তৈরিতে অবিশ্বাস্য পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।
আমরা যদি টেক্সটাইল বা সিমেন্ট মিলের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের মাত্র ২০ শতাংশও স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করতে পারি, তবে প্রতি বছর সাশ্রয় হবে প্রায় ১০-১৫ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। এটি কেবল অর্থই বাঁচাবে না, বরং বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এজন্য হালকা প্রকৌশলকে এগিয়ে নিতে হলে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কেননা, আমাদের কারিগররা মেধাবী হলেও তারা আজও পুরানো আমলের মেশিনে কাজ করেন। তাদের হাতে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত আধুনিক মেশিন তুলে দিতে হবে। বগুড়াকে আমরা ‘জাতীয় কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদন জোন’ হিসেবে ঘোষণা করে এখানে আধুনিক ফাউন্ড্রি ও ল্যাব স্থাপন করতে পারি, যেন কৃষিতে ব্যবহৃত শ্যালো ইঞ্জিন থেকে শুরু করে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টারের পার্টস তৈরি করে যায়। ঢাকার ধোলাইখাল ও জিঞ্জিরার কারিগরদের জন্য একটি ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ভিলেজ’ তৈরি করে তাদের আইনগত বৈধতা ও পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আমরা বড় ভূমিকা পালন করে বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আমদানি-নির্ভরতা কমাতে পারব। তবে আমদানি বিকল্প শিল্পায়নের পথে প্রধান বাধা হলো জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের ঋণ। স্থানীয় উদ্যোক্তারা প্রায়ই অভিযোগ করেন, কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক দিতে হলেও তৈরি পণ্য আমদানিতে অনেক সময় ছাড় দেওয়া হয়, যা দেশীয় শিল্পের বিকাশে বাধা। এই নীতিগত বৈষম্য দূর করা জরুরি। সরকার যদি দেশীয় পণ্যের সুরক্ষায় ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে উৎসাহিত করে, তবে ডলারের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা কমে আসবে।
পরিশেষে, ডলার সংকটের সমাধান কেবল রেমিটেন্স বা রপ্তানি আয় বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমাদের আমদানির চাহিদা কমানোর ওপরও জোর দিতে হবে। আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় শিল্পের ভিত্তি শক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। যদি সরকার ও নীতিনির্ধারকরা এই ক্রান্তিকালে দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প নিয়ে এগিয়ে আসেন, তবেই বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী অর্থনীতির পথে হাঁটতে পারবে।
সূত্র: জনকণ্ঠ
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

