উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তিন বছর ধরে অনেক কষ্টে আছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। সাম্প্রতিককালে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য অনুসারে ওই মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আগের মাস জুনে ছিল ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য, অভ্যন্তরীণ ফসলহানি এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণের কারণে মূল্যস্ফীতির ওই উল্লস্ফন অনুভূত হয়েছিল।
২০২৪-এর জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল আগের ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। এর আগের মাসে ছিল ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ। ওই পঞ্জিকা বর্ষে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। এরপর গত ১৫ মাসে মূল্যস্ফীতির হার হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু এখনো তা উদ্বেগজনক উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ৮ শতাংশের ওপরে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ৭ শতাংশের ওপরে ঝুলে আছে। এ সময়ের মধ্যে শ্রীলংকা, পাকিস্তান ও ভারতের মূল্যস্ফীতির হারে দারুণ উন্নতি লক্ষ করা গেছে। সে তুলনায় বাংলাদেশের অগ্রগতি খুবই শ্লথগতির।
মূল্যস্ফীতি হ্রাসে অন্তর্বর্তী সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। নীতি সুদহার বাড়িয়েছে ১০ শতাংশে। কিছু পণ্যে কর ও শুল্কহার কমিয়েছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণে সরকারের অক্ষমতার কারণে আয় সীমিত থেকেছে। অথচ কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ সার্বিক ব্যয় বৃদ্ধি রাজকোষে চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে পরিচালন ব্যয় মেটানোর জন্য সরকারকে ঋণ নিতে হয়েছে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে। অন্যদিকে রুগ্ণ ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য উদার হস্তে অর্থ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটা এক ধরনের বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো। একদিকে নীতি সুদহার বাড়িয়ে অর্থ সরবরাহ কষানো হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের পরিচালন খাতে ও রুগ্ণ ব্যাংকগুলোকে অর্থ সহায়তা করে তারল্য সঞ্চালন বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এমন দ্বৈত আচরণের কারণেই বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি উঁচু স্তরে ঘুরপাক খাচ্ছে।
সর্বশেষ মূল্যস্ফীতির হিসাব প্রকাশিত হয়েছে গত নভেম্বরের জন্য। বিবিএস পরিবেশিত তথ্য অনুযায়ী মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে। এর আগের মাস অক্টোবরে এ হার ছিল ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার নভেম্বরে হয়েছে ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ, অক্টোবরে ছিল ৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। মূলত খাদ্যশস্য ও শাকসবজির মূল্যবৃদ্ধি খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির জন্য দায়ী। ডিসেম্বরে নতুন আমন চালের সরবরাহ বাড়বে। শীতকালীন সবজির সরবরাহও বাড়বে। তাতে কিছুটা নমনীয় হবে মূল্যস্ফীতির হার। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে প্রাক্কলিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর অনেকটা নিশ্চিত করে বলেছিলেন যে এবার ৬ শতাংশে নেমে আসবে মূল্যস্ফীতির হার। বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি।
অনেকে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে নির্ধারণের সমালোচনা করছেন। সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার যখন ৮ শতাংশের ওপরে থাকে তখন নীতি সুদহার ১০ শতাংশ হওয়া বেশি নয়। তবে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য তা কিছুটা কমানো যেতে পারে। বিগত সরকারের আমলে নীতি সুদহার মূল্যস্ফীতির হারের অনেক নিচে নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাতে ঋণের প্রবাহ বেড়েছে। বিদেশে টাকা পাচার হয়েছে। দুর্বৃত্তায়নে রুগ্ণ হয়ে গেছে ব্যাংক খাত। ক্ষুদ্র আমানতকারীদের লোকসানের বদৌলতে আর্থিক সুবিধা নিয়েছে কিছুসংখ্যাক স্বার্থান্বেষী মানুষ। আর্থিক খাতে তেমন অরাজকতা কাঙ্ক্ষিত নয়।
চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির হার কুলিয়ে উঠছে না। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর কষ্টের বোঝা বাড়ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এটি মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ থেকে কম। কয়েক মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার লাগাতার কমই পর্যবেক্ষণ করা গেছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে বেকারত্ব। জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে নেমে এসেছে শ্লথগতি। তাতে বেড়েছে দারিদ্র্য। বেড়েছে সাধারণ মানুষের দুর্গতি। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে মূল্যস্ফীতির হারকে দ্রুত কমানো দরকার। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণের সঙ্গে সরকারের ব্যয় কমানো দরকার। উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজারে পণ্য সরবরাহ নির্বিঘ্ন করা দরকার। সিন্ডিকেটের কারসাজি থেকে ভোক্তাদের মুক্ত করা দরকার।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে অর্থনীতির আর একটি দুষ্টক্ষত ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব আমাদের সমাজ জীবনকে কুরে খাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, আইন-শৃঙ্খলার ঘাটতি, জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের দামে ঊর্ধ্বগতি এবং ঋণের উচ্চ সুদ শিল্পোদ্যোগকে দমিয়ে রাখছে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে এখন চরম খরা চলছে। তাতে নতুন কর্মসংস্থানে ভাটা পড়েছে। এক হিসাবে দেখা যায়, বর্তমানে প্রায় এক কোটি মানুষ বেকার। শিক্ষিত লোকদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার বেশি। প্রতি বছর ২০-২৫ লাখ লোক শ্রমবাজারে আসছে। কিন্তু তাদের চাকরি নেই। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অন্যান্য কারণে একের পর এক অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। তৈরি পোশাক খাতে এর প্রভাব বেশি।
তাতে বেকার হয়ে গেছে লাখ লাখ কর্মজীবী মানুষ। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হয় বেসরকারি খাতে। কিন্তু বর্তমানে তা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। অধিকাংশ ঋণ চলে যাচ্ছে সরকারি খাতে। বেসরকারি খাত তাতে বড় ধরনের বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ। এখন তা ২৭ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাতে ‘ক্রাউড আউট’ প্রভাব পড়েছে সার্বিক ঋণের ক্ষেত্রে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ শতাংশে। অনেক উদ্যোক্তা এখন অপেক্ষা করে আছেন এই ভেবে যে সামনে ঋণের সুদহার কমবে এবং নতুন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসবে। তখন সব দিক দেখেশুনে তারা বিনিয়োগ করবেন। এরই মধ্যে শ্রমবাজারে যে ক্ষতি হয়েছে তা বিস্তর।
শিল্পের উৎপাদনে ও ব্যবসা-বাণিজ্যে শান্তির পরিবেশ নিশ্চিত করা ছাড়া তার প্রতিবিধান দুষ্কর। এরই মধ্যে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বড় ধস নেমেছে। এক সময়ের কথিত উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে নেমে এসেছে। কৃষি খাতে এ প্রবৃদ্ধির হার নিম্নতম ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। শিল্পেও ধস, প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ দুটো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ এবং উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়া মূল্যস্ফীতি হ্রাস ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় ১৫ মাস ধরে আমরা একটি ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ কাল অতিক্রম করছি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে কর্মসংস্থানের বন্ধ্যাত্ব। দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা বর্তমান সরকারের হাল ধরে আছেন। তা সত্ত্বেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তেমন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। হয়তো আমরা আরো ঘনিষ্ঠভাবে উন্নয়নের সঙ্গে নিবিষ্ট হতে পারিনি। অথবা ততটা সময়ও পাওয়া যায়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে লালিত উচ্চ দারিদ্র্যের হারে কোনো উন্নতি হয়নি, বরং অবনতি হয়েছে।
চলতি বছর এ হার ২১ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। কর্মসংস্থানের সংকট, চাকরি হারানো, স্থবির মজুরি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি এ দারিদ্র্য বৃদ্ধির মূল কারণ। দেশে বর্তমানে সোয়া ছয় কোটি মানুষ দারিদ্র্যের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। গত দুই বছরে ২০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। চলতি অর্থবছরে আরো প্রায় আট লাখ মানুষের বেকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অধিকন্তু সামাজিক সুরক্ষা খাতে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে বৈষম্য কমছে না। সেক্ষেত্রে নারীরা বড় বৈষম্যের শিকার।
বাংলাদেশে নিবিড় দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ আয় ও সম্পদবণ্টনে বৈষম্য। জাতীয় আয়ের বড় অংশই ধনী শ্রেণীর মানুষের পকেটে চলে যাচ্ছে। অল্প সংখ্যক ধনীর হাতেই রয়েছে দেশের বেশির ভাগ সম্পদ। এক্ষেত্রে সম্পদের বৈষম্য আয়বৈষম্যকে উসকে দিচ্ছে। সেটি বাড়িয়ে দিচ্ছে দারিদ্র্য। প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকসের বৈশ্বিক অসমতা প্রতিবেদন-২০২৬ থেকে প্রতীয়মান হয় যে দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশের মালিকানা পুঞ্জীভূত রয়েছে।
অন্যদিকে নিম্নের ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ সম্পদের মালিকানা। অনুরূপভাবে জাতীয় আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশই চলে যায় শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে। পক্ষান্তরে নিম্ন আয়ের ৫০ শতাংশ মানুষের মোট আয় মাত্র ১৯ শতাংশ। দেশের ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য হ্রাস করতে হলে বৈষম্য দূর করতে হবে। নতুবা জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির সুফল সুবিধাভোগী বা ক্ষমতালোভী শ্রেণীই ভোগ করবে। এক্ষেত্রে দক্ষ ও ন্যায়সংগত সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা কার্যক্রম দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসে সহায়ক হতে পারে। এটি দেশের সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। তবে এ বিষয়ের কার্যক্রম ও প্রভাব খুবই ক্ষীণ।
অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে আর অল্প কয়েক মাস সময় আছে। এ স্বল্প সময়ে বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব না হলেও তার গোড়াপত্তন করে যাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে সরকারের পরিচালন ব্যয় হ্রাস, সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম জোরদার, উৎপাদনশীল খাতগুলোতে গুরুত্ব প্রদান, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির উচ্ছেদ এবং দুর্নীতি হ্রাস এখন সময়ের দাবি। যত্নের সঙ্গে তা প্রণিধান করা উচিত। অনেক সময় রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে কোনো কোনো অপ্রীতিকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর তেমন কোনো চাপ থাকে না। এ সুযোগ তাদের গ্রহণ করা উচিত।
ড. জাহাঙ্গীর আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ; সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি); সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) এবং সাবেক পরিচালক, ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকস। সূত্র: বণিক বার্তা

