সরকারের পক্ষ থেকে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার ঘোষণা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে এটি দেশের শেয়ারবাজারের জন্য একটি গেম চেঞ্জিং পদক্ষেপ হতে পারে।
মামুন রশীদ, ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক। প্রায় ৪০ বছর দেশে ও বিদেশে আর্থিক খাতে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। ১০ বছর বিএসইসির হয়ে মনোনীত পরিচালক ছিলেন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ গ্রামীণফোনের আইপিওর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেড এবং বিডি ভেঞ্চারের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি তিনি পুঁজিবাজারের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন।
দেশের শেয়ারবাজার কার্যত মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি—উভয় ক্ষেত্র থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে? এই বিচ্ছিন্নতার মূল কারণগুলো কী কী বলে আপনি মনে করেন?
দেশের শেয়ারবাজার যে আজ কার্যত মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি—উভয় ক্ষেত্র থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত ভুল, কাঠামোগত দুর্বলতা ও আস্থাহীনতার যৌথ ফল। সাধারণভাবে একটি কার্যকর পুঁজিবাজার মুদ্রানীতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকে তারল্য প্রবাহ, সুদের হার ও বিনিয়োগ চক্রের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশে মুদ্রানীতি প্রায় পুরোপুরি ব্যাংক খাতকেন্দ্রিক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়ালেও বা কমালেও তার প্রভাব শেয়ারবাজারে পড়ে না, কারণ বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর উপস্থিতি খুবই সীমিত। ফলে মুদ্রানীতির সংকেত শেয়ারবাজার পর্যন্ত পৌঁছায় না।
একইভাবে রাজস্বনীতির সঙ্গেও পুঁজিবাজারের কার্যকর সংযোগ গড়ে ওঠেনি। বাজেটে করছাড়, প্রণোদনা বা বিনিয়োগবান্ধব ঘোষণাগুলো মূলত শিল্প ও ব্যবসা খাতে ব্যাংক ঋণ বা সরাসরি বিনিয়োগের জন্য প্রযোজ্য হয়। পুঁজিবাজারকে শিল্পায়নের অর্থায়নের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা বাজেটে খুব কমই দেখা যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে তালিকাভুক্ত করার মতো কৌশলগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অভাব এ বিচ্ছিন্নতাকে আরো গভীর করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়ন্ত্রণ অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকট। ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তন, অতীতের কারসাজি ও দুর্বল শাসন কাঠামোর কারণে পুঁজিবাজারকে নীতিনির্ধারকরাও একটি কার্যকর নীতিগত হাতিয়ার হিসেবে আর বিবেচনা করছেন না। ফলে শেয়ারবাজার আজ অর্থনীতির মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক প্রান্তিক প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়।
বিশ্বব্যাপী শিল্পায়নের মূলধনের বড় অংশ আসে পুঁজিবাজার থেকে। অথচ বাংলাদেশে শিল্পায়নের অর্থায়নে ব্যাংক খাতই প্রধান। এ বাস্তবতায় পুঁজিবাজার কেন কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না?
বিশ্বের প্রায় সব সফল শিল্পোন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিতে শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের প্রধান উৎস হলো পুঁজিবাজার। কারণ শিল্প বিনিয়োগ স্বভাবতই দীর্ঘমেয়াদি, ঝুঁকিপূর্ণ এবং ধৈর্যনির্ভর। অথচ বাংলাদেশে শিল্পায়নের অর্থায়ন এখনো মূলত ব্যাংক খাতনির্ভর, যা কাঠামোগতভাবে একটি বড় অসংগতি। এর প্রধান কারণ হলো দেশের পুঁজিবাজারকে কখনই কৌশলগতভাবে শিল্পায়নের অর্থায়নের প্লাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি।
প্রথমত, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগযোগ্য মানসম্মত ইকুইটির ঘাটতি দীর্ঘদিনের। বড়, সুসংগঠিত ও লাভজনক কোম্পানিগুলোর বাজারে আসার প্রবণতা খুবই কম। রাষ্ট্রায়ত্ত ও শীর্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত করার রাজনৈতিক ও নীতিগত সদিচ্ছার অভাব এই সংকটকে আরো গভীর করেছে। দ্বিতীয়ত, আইপিও প্রক্রিয়া দীর্ঘ, জটিল ও ব্যয়বহুল হওয়ায় উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারের পরিবর্তে ব্যাংক ঋণ বা প্রাইভেট ইকুইটির দিকে ঝুঁকছেন।
তৃতীয়ত, বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর উপস্থিতি দুর্বল। পেনশন ফান্ড, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও বীমা খাতের বিনিয়োগ এখনো সীমিত ও রক্ষণশীল। ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা ও গভীরতা তৈরি হয়নি। সবশেষে নিয়ন্ত্রণ দুর্বলতা ও অতীতের কারসাজি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করেছে। এসব কারণে পুঁজিবাজার শিল্পায়নের মূলধন জোগানের পরিবর্তে আজও প্রান্তিক ভূমিকায় সীমাবদ্ধ।
২০২৫ সালে বছরজুড়ে কোনো আইপিও না আসা দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে? আপনি এটিকে কতটা গভীর সংকটের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন?
২০২৫ সালে বছরজুড়ে কোনো আইপিও না আসা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ও গভীরভাবে উদ্বেগজনক ঘটনা। এটিকে কেবল সাময়িক বাজার মন্দা হিসেবে দেখলে বাস্তবতাকে খাটো করা হবে। বরং এটি পুঁজিবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা ও আস্থাহীনতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন। একটি কার্যকর অর্থনীতিতে আইপিও মানেই নতুন শিল্প, নতুন উদ্যোক্তা এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগের সূচনা। যখন দীর্ঘ সময় ধরে আইপিও বন্ধ থাকে, তখন শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের প্রবাহ কার্যত থেমে যায়।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্পায়নের গতির ওপর। নতুন কারখানা স্থাপন, সক্ষমতা সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়, বিশেষ করে সংগঠিত ও মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখেন বা আকার ছোট করে ফেলেন, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে দুর্বল করে।
এ পরিস্থিতিকে আমি একটি গভীর সংকটের লক্ষণ হিসেবেই দেখি। কারণ একটি বছর আইপিও না আসা মানে শুধু বাজারে নতুন শেয়ার না আসা নয়। এর অর্থ হলো, পুঁজিবাজারকে শিল্পায়নের অর্থায়নের মাধ্যম হিসেবে উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকরা কার্যত পরিত্যাগ করছেন। দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার ছাড়া এ প্রবণতা চলতে থাকলে পুঁজিবাজার আরো প্রান্তিক হয়ে পড়বে, যার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি পুরো অর্থনীতিকেই বহন করতে হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার অর্থনৈতিক অরাজকতার কারণে পুঁজিবাজারের প্রতি উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। আপনি কি এ ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত? নাকি এর পেছনে আরো কাঠামোগত কারণ রয়েছে?
বর্তমান সরকার পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার অর্থনৈতিক অরাজকতার কারণে পুঁজিবাজারের প্রতি উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতা তৈরির বিষয়ে যে ব্যাখ্যা দিয়েছে তা আংশিকভাবে সত্য, কিন্তু এটিকে একমাত্র বা প্রধান কারণ হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। নিঃসন্দেহে বিগত সময়ে শেয়ারবাজারে কারসাজি, দুর্বল তদারকি, কিছু বড় খেলাপি গোষ্ঠীর প্রভাব এবং বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির ঘটনা উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের মনে নেতিবাচক ছাপ ফেলেছে। তবে আস্থাহীনতার শিকড় আরো গভীরে প্রোথিত।
মূল সমস্যা হলো পুঁজিবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা, যা এক বা দুই সরকারের আমলে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে বাজারে মানসম্মত ও বড় মূলধনের কোম্পানির ঘাটতি, আইপিও প্রক্রিয়ার জটিলতা ও অনিশ্চয়তা, এবং নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতার অভাব উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করেছে। আজও একজন উদ্যোক্তা নিশ্চিত হতে পারেন না যে বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর নীতিমালা হঠাৎ বদলে যাবে না বা মূল্য আবিষ্কার প্রক্রিয়া কৃত্রিমভাবে বিকৃত হবে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক খাতনির্ভর অর্থায়নের সহজলভ্যতা। অনেক ক্ষেত্রে কম সুদে পুনঃতফসিল, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নমনীয় ঋণ কাঠামো উদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজারের কঠোর স্বচ্ছতার মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজন কমিয়ে দিয়েছে। ফলে পুঁজিবাজারে অনাগ্রহ একটি সাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ফল নয়। এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ব্যর্থতারই প্রতিফলন। এ বাস্তবতা স্বীকার না করলে আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।
অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ভালো ও শক্তিশালী কোম্পানির আইপিও বাজারে এলে তারল্য বাড়ে এবং নতুন বিনিয়োগকারী আসে। তাহলে বিএসইসি কেন এখনো কার্যকরভাবে মানসম্মত কোম্পানিকে আইপিওতে আনতে পারছে না এবং নিম্নমুখী বাজারে আইপিও আনতে উৎসাহ দেয়ার জন্য কী ধরনের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
অতীত অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে বাজারে যখন ভালো ও শক্তিশালী কোম্পানির আইপিও আসে, তখন তারল্য বাড়ে, বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ে এবং বাজারে একটি ইতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটে। সেই বাস্তবতা জানা সত্ত্বেও বিএসইসি এখনো কার্যকরভাবে মানসম্মত কোম্পানিকে আইপিওতে আনতে পারছে না। এর পেছনে মূলত নীতিগত অনিশ্চয়তা ও কাঠামোগত দুর্বলতাই দায়ী।
প্রথমত, আইপিও প্রক্রিয়া এখনো অতিমাত্রায় জটিল, দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। একজন ভালো উদ্যোক্তার কাছে পুঁজিবাজারে আসার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সময়মতো অনুমোদন না পাওয়া এবং মূল্য নির্ধারণে অনিশ্চয়তা। অনেক ক্ষেত্রেই আইপিও প্রক্রিয়া শেষ হতে হতে বাজার পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ফলে প্রত্যাশিত মূলধন সংগ্রহের সুযোগ নষ্ট হয়। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকতার অভাব উদ্যোক্তাদের আস্থা দুর্বল করেছে। নীতিমালা ঘন ঘন পরিবর্তন হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা সম্ভব হয় না।
নিম্নমুখী বাজারে আইপিও আনতে হলে সক্রিয় নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে আইপিও প্রক্রিয়া সহজ ও সময়সীমাবদ্ধ করা, মূল্য নির্ধারণে বাস্তবসম্মত ও বাজারভিত্তিক কাঠামো চালু করা এবং প্রথমদিকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ভালো কোম্পানির আইপিওকে কর প্রণোদনা ও নীতিগত স্থিতিশীলতার আশ্বাস দেয়া হলে উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরতে পারে। শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, বাজার উন্নয়নের মানসিকতাই এখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
বিগত সময়ে পুঁজিবাজারে অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগ ভালো কোম্পানিগুলোকে বাজার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে বলে অনেকের মত। এ আস্থাহীনতা কাটাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সবচেয়ে বড় ঘাটতি কোথায়?
বিগত সময়ে পুঁজিবাজারে অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগ যে ভালো ও শক্তিশালী কোম্পানিগুলোকে বাজার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এই আস্থাহীনতার মূল কারণ শুধু কিছু অনিয়মের ঘটনা নয়। বরং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য শাসন কাঠামোর অভাব। একটি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা প্রথমেই যে নিশ্চয়তাটি চান, তা হলো নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হবে এবং অপরাধের শাস্তি হবে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক। এ জায়গাটিতেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
কারসাজির অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্ত দীর্ঘসূত্রতা, অস্বচ্ছতা এবং শেষ পর্যন্ত কার্যকর শাস্তির অভাবে নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। ফলে বাজারে একটি ভুল বার্তা গিয়েছে যে অনিয়ম করলে ঝুঁকি কম, কিন্তু নিয়ম মেনে চললে লাভের নিশ্চয়তা নেই। এটি ভালো কোম্পানি ও সুশাসনমনা উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় নিরুৎসাহ। দ্বিতীয়ত, নীতিমালা প্রয়োগে ধারাবাহিকতার অভাব এবং ক্ষেত্রবিশেষে নির্বাচনী কঠোরতা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বচ্ছ যোগাযোগের ঘাটতি। বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বাজার অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ না হওয়ায় অনেক নীতি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়েছে। ফলে আস্থা সংকট আরো গভীর হয়েছে। এ পরিস্থিতি কাটাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে বিশ্বাসযোগ্য তদারকি, সময়মতো সিদ্ধান্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। আস্থা ফিরবে কেবল তখনই, যখন ন্যায়সংগত নিয়ম বাস্তবে প্রতিফলিত হবে।
অনেকেই বলছেন, শেয়ারবাজারে পর্যাপ্ত বিনিয়োগযোগ্য ইকুইটির অভাবই প্রধান সমস্যা। আপনি কি মনে করেন, বাজারে নতুন ইকুইটি না এলে অন্য সব সংস্কারই কার্যত নিষ্ফল থেকে যাবে?
শেয়ারবাজারে পর্যাপ্ত বিনিয়োগযোগ্য ইকুইটির অভাব যে বর্তমান সংকটের অন্যতম মূল সমস্যা, এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বাজারে নিয়মিত নতুন ও মানসম্মত ইকুইটি না এলে অন্যান্য অনেক সংস্কারই শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। কারণ পুঁজিবাজারের প্রাণশক্তি আসে বৈচিত্র্যময় ও শক্তিশালী কোম্পানির উপস্থিতি থেকে। যদি বিনিয়োগকারীদের সামনে বিনিয়োগযোগ্য বিকল্পই না থাকে, তাহলে লেনদেন বাড়ানো, তারল্য বৃদ্ধি বা আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
আমরা প্রায়ই সার্কিট ব্রেকার, মার্জিন ঋণ, টিক সাইজ বা লেনদেন বিধিমালার মতো কারিগরি সংস্কার নিয়ে আলোচনা করি। এগুলো প্রয়োজনীয় হলেও মূল সমস্যার সমাধান নয়। মূল সমস্যা হলো বাজারে ভালো কোম্পানি নেই অথবা আছে খুবই সীমিত সংখ্যায়। ফলে একই ধরনের কিছু শেয়ারের মধ্যেই লেনদেন ঘোরাফেরা করে, যা অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামা ও কারসাজির ঝুঁকি বাড়ায়।
তবে এটাও সত্য, শুধু নতুন ইকুইটি আনলেই সব সমস্যার সমাধান হবে—এমনটি ভাবাও সরলীকরণ হবে। নতুন ইকুইটির সঙ্গে সঙ্গে স্বচ্ছ আইপিও প্রক্রিয়া, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা জরুরি। কিন্তু এ তিনটির কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে নতুন ইকুইটির প্রবাহ। একে উপেক্ষা করে অন্য সংস্কারে জোর দিলে পুঁজিবাজারে বাস্তব পরিবর্তন আসবে না।
সরকারের পক্ষ থেকে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার কথা বলা হলেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বাজারে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?
সরকারের পক্ষ থেকে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার ঘোষণা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে এটি দেশের শেয়ারবাজারের জন্য একটি গেম চেঞ্জিং পদক্ষেপ হতে পারে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অন্যতম বড় সংকট হলো বিনিয়োগযোগ্য মানসম্মত ও বড় মূলধনের কোম্পানির অভাব। রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকাভুক্ত হলে এ ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হবে এবং বাজারের গভীরতা ও পরিসর বাড়বে।
প্রথমত, এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, স্থিতিশীল নগদ প্রবাহ ও বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা পুনরায় সক্রিয় হওয়ার প্রণোদনা পাবেন। দ্বিতীয়ত, বড় মূলধনের নতুন ইকুইটি যুক্ত হলে বাজারে তারল্য বাড়বে এবং সূচকের ওঠানামা আরো বাস্তবভিত্তিক হবে।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হলে করপোরেট গভর্ন্যান্স ও জবাবদিহির সংস্কৃতি শক্তিশালী হবে। নিয়মিত অডিট, প্রকাশ্য আর্থিক প্রতিবেদন এবং শেয়ারহোল্ডারদের নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে সরকারও বাজারভিত্তিক মূলধন সংগ্রহের একটি টেকসই বিকল্প পাবে, যা বাজেটের ওপর চাপ কমাতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারকে শিল্পায়নের অর্থায়নের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। তবে এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং ধারাবাহিক নীতিগত অঙ্গীকার অপরিহার্য।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে যেতে অনাগ্রহী। এ অবস্থায় পুঁজিবাজারকে আবার শিল্পায়নের অর্থায়নের কেন্দ্রে আনতে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহ কেবল চাহিদা মন্দা বা বৈদেশিক চাপের ফল নয়। এটি মূলত নীতিগত অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকটের প্রতিফলন। এ প্রেক্ষাপটে পুঁজিবাজারকে আবার শিল্পায়নের অর্থায়নের কেন্দ্রে আনতে হলে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত, সুস্পষ্ট এবং ধারাবাহিক পদক্ষেপের বিকল্প নেই।
প্রথমত, সরকারের পক্ষ থেকে পুঁজিবাজারকে শিল্পায়নের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। বাজেট ও রাজস্বনীতিতে আইপিও, করপোরেট বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডকে উৎসাহিত করার জন্য কর প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা থাকতে হবে। একই সঙ্গে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত ও বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত করার একটি সময়বদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাজার উন্নয়নের ভূমিকা নিতে হবে। আইপিও প্রক্রিয়া সহজ, সময়সীমাবদ্ধ ও পূর্বানুমেয় করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। মূল্য নির্ধারণ ও বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে বাস্তবতা ও নমনীয়তা আনাও প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পেনশন, বীমা ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিনিয়োগ নীতিতে সংস্কার দরকার। একই সঙ্গে বাজারে সুশাসন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এ উদ্যোগগুলো খণ্ডখণ্ড নয়, বরং সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তবেই পুঁজিবাজার আবার শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসতে পারে।
সবশেষে দ্রুত ও দৃশ্যমান সংস্কার না হলে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আপনি কোন অবস্থানে দেখতে পাচ্ছেন?
যদি দ্রুত ও দৃশ্যমান সংস্কার না হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আমি আরো প্রান্তিক, দুর্বল ও অর্থনীতির মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থানেই দেখতে পাচ্ছি। এ বাজার ইতোমধ্যেই শিল্পায়নের অর্থায়নের কেন্দ্র হিসেবে তার ভূমিকা হারিয়েছে। সংস্কার বিলম্বিত হলে সেই দূরত্ব আরো বাড়বে। তখন পুঁজিবাজার কার্যত একটি সংকুচিত সেকেন্ডারি মার্কেটে পরিণত হবে, যেখানে নতুন বিনিয়োগ বা মূলধন সৃষ্টির পরিবর্তে কেবল সীমিত পরিসরে পুরনো শেয়ারের হাতবদল চলবে।
এর প্রথম প্রভাব পড়বে বিনিয়োগকারীদের ওপর। দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে আরো দূরে সরে যাবে, আর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্রমাগত ক্ষতির অভিজ্ঞতায় বাজার ত্যাগ করবে। ফলে তারল্য আরো কমবে, লেনদেন সংকুচিত হবে এবং অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামা ও কারসাজির ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারকে এড়িয়ে ব্যাংক ঋণ বা প্রাইভেট ইকুইটির ওপর নির্ভরতা বাড়াবে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনীতির জন্য এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে আরো গভীর। ব্যাংক খাতের ওপর শিল্পায়নের অর্থায়নের চাপ বাড়বে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি করবে। কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের গতি মন্থর হয়ে পড়বে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো একটি দুর্বল পুঁজিবাজার নীতিনির্ধারকদের কাছেও গুরুত্ব হারাবে। তখন এটি সংস্কারের নয়, বরং ব্যবস্থাপনার বাইরে থাকা একটি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হবে। এই পরিস্থিতি এড়াতে দ্রুত কম সময়ে সাহসী, সময়োপযোগী ও বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার শুরু করা অপরিহার্য। সূত্র: বণিক বার্তা

