আবারো ব্যাপক বিক্ষোভে উত্তাল ইরান। রাস্তায় নেমেছে মানুষ। আগুন শুধু টায়ারে নয়—জ্বলছে ক্ষোভ, হতাশা আর দীর্ঘদিনের দমিয়ে রাখা আর্তনাদে। প্রশ্ন উঠছে, এটা কি আরেকটি ক্ষণস্থায়ী গণজাগরণ, নাকি ১৯৭৯–এর পর ইরান নতুন কোনো বিপ্লবের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে? সরকার পতন কি কেবল সময়ের ব্যাপার? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ইরানের ইতিহাস, অর্থনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজের গভীরে জমে থাকা ক্ষতগুলো একসঙ্গে দেখতে হবে।
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবে কোনো জেন-জি আন্দোলন ছিল না। সেটি ছিল শাহ রেজা পাহলভির স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক বিশাল সামাজিক বিস্ফোরণ। আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে সেই বিপ্লব রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল।
বিপ্লবের ভাষা ছিল ইসলামি, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা ছিল মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও আত্মপরিচয়ের। চার দশক পর আজ যে ইরানের জনগণ রাস্তায় নেমেছে, তার ভাষা ভিন্ন, দাবিও ভিন্ন। আজকের আন্দোলনের মুখে জেন-জি তরুণ-তরুণী, নারীরা, শ্রমজীবী মানুষ, মধ্যবিত্ত। যারা ধর্মীয় শাসনের নামে চাপিয়ে দেওয়া বিধিনিষেধ, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতিতে ক্লান্ত। এসব অনিয়মকে তারা বিদায় দিতে চাই।
ইরানে যে বিক্ষোভ ঘুরেফিরে দেখা দেয়, তা কোনো একক ঘটনার ফল নয়। এটি দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি এবং দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফল। নিষেধাজ্ঞা যেমন অর্থনীতিকে চেপে ধরেছে, তেমনি রাষ্ট্র সেই চাপ সামলাতে গিয়ে আরও কড়াকড়ি আরোপ করেছে সমাজের ওপর। ফলাফল একটাই জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের দূরত্ব বেড়েছে বহুগুণ।
২০২৫ সালের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে সূত্রপাত হয়েছিল ব্যবসায়ী ও বাজারের দোকানিদের ধর্মঘট থেকে। হঠাৎ করে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে ঠেকেছিল। মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কায় ইরানের রিয়ালের মূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়। বেকারত্ব বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশে। এই দৃশ্য নতুন নয়।
২০০৮ সালে মূল্য সংযোজন কর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পর তেহরানের বাজার এলাকাগুলোয় বড় বিক্ষোভ হয়েছিল। সেবার সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। ২০১০ সালে আয়করের হার ৭০ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগও জনরোষে থেমে যায়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ইস্যুতে ইরানের জনগণ বরাবরই প্রতিবাদী ছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক দাবির সঙ্গে ইরানে সব সময়ই জুড়ে গেছে সামাজিক স্বাধীনতার প্রশ্ন।
বাধ্যতামূলক হিজাব আইন তার বড় উদাহরণ। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যু সেই ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে। হিজাব না পরার অভিযোগে আটক এক তরুণীর হেফাজতে মৃত্যু ইরানের সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। রাষ্ট্র যখন দায় স্বীকার না করে উল্টো ভুক্তভোগীকেই দায়ী করতে চায়, তখন ক্ষোভ দাবানলে রূপ নেয়। শত শত প্রাণ ঝরলেও সেই ক্ষোভ নিভে যায়নি, কেবল চাপা পড়েছিল।
চার দশক পর আজ যে ইরানের জনগণ রাস্তায় নেমেছে, তার ভাষা ভিন্ন, দাবিও ভিন্ন। আজকের আন্দোলনের মুখে জেন-জি তরুণ-তরুণী, নারীরা, শ্রমজীবী মানুষ, মধ্যবিত্ত।
এই দীর্ঘ সময়ে কোনো সরকারই মৌলিক সংস্কার আনতে পারেনি। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি তেল নির্ভরতা কমানোর কথা বলেছিলেন, নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার কৌশল দিয়েছিলেন। কিন্তু পারমাণবিক সংকট ও আন্তর্জাতিক চাপ সেই প্রচেষ্টাকে ভেস্তে দেয়।
মাহমুদ আহমাদিনেজাদের জনতাবাদী ‘তেল থেকে নগদ’ নীতিও ব্যর্থ হয়। একদিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর বাধা, অন্যদিকে জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞা কাল হয়ে দাঁড়ায়। ১৬৯৬ থেকে ১৯২৯ পর্যন্ত একটির পর একটি প্রস্তাব ইরানের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দেয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা যোগ হয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলে তেহরানের জন্য।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য দায় কার? নিষেধাজ্ঞা, না শাসনব্যবস্থা? বাস্তবতা হলো, দুটোই। ইরানের অর্থনীতি বহুদিন ধরে কাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত। বিপ্লবী আদর্শ ও তার ব্যয়ের পেছনে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে একটি দক্ষ, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি গড়ে তোলা হয়নি। আর্থিক ও অর্থনৈতিক আইনকানুন বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে ইরান ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়েছে, আর নিষেধাজ্ঞার আঘাত আরও গভীর হয়েছে।
চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বও সেই ক্ষত সারাতে পারেনি। ২৫ বছরের ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি, কিংবা রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা সবই কাগজে শক্তিশালী শোনালেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার ক্ষতি পুষিয়ে দিতে ব্যর্থ। জনগণের চোখে তাই পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যের গল্প আর বিশ্বাসযোগ্য হয়নি।
একসময় ইরানের মানুষ বলত, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের খরচেই দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হচ্ছে। কিন্তু ২০২৫ সালের শুরুতে এসে সেই যুক্তিও দুর্বল হলো। লেবানন, সিরিয়া, গাজা ও ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব কমেছে। তবু অর্থনৈতিক সংকট কাটেনি। এই বাস্তবতায় প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বীকার করেছেন যে, সব দায় নিষেধাজ্ঞার নয়।
এই স্বীকারোক্তি আসলে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতাকেই সামনে এনেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরেই বিভ্রান্তি এটি এখন সত্য। একদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যর্থতা মানছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে। এই দ্বৈত ব্যাখ্যা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর চোখে প্রতিবাদ মানেই রাষ্ট্রের অস্তিত্বের হুমকি। ফলে দমননীতি আরও কঠোর হয়, আর সরকার ও জনগণের দূরত্ব আরও বাড়ে।
…প্রশ্ন থেকেই যায়—ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য দায় কার? নিষেধাজ্ঞা, না শাসনব্যবস্থা? বাস্তবতা হলো, দুটোই। ইরানের অর্থনীতি বহুদিন ধরে কাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত।
এই দূরত্বই ইরানের সবচেয়ে গভীর সংকট। চার দশকের বেশি সময় ধরে সমাজ আর রাষ্ট্র একে অপরের ওপর আস্থা হারিয়েছে। বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্র উৎখাত করে যে সমাজ আরেকটি নৈতিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল, সে সমাজ আজ আরেক ধরনের অনমনীয় ক্ষমতা কাঠামোর ভেতর বন্দি। ভিন্নমত মানেই ষড়যন্ত্র, প্রশ্ন মানেই অপরাধ। বাইরে নীরবতা, ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ—এই মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতই আজ বিস্ফোরিত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভে যে নতুন ভাষা দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। খামেনির ছবিতে আগুন ধরিয়ে সেই আগুনে সিগারেট জ্বালানো হয়েছে। এটি শুধু প্রতিবাদের ছবি নয় বরং এটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একযোগে চ্যালেঞ্জ। যেখানে খামেনির ছবি পোড়ানো গুরুতর অপরাধ, আর নারীদের প্রকাশ্যে ধূমপান ‘অশালীন’, সেখানে এই প্রতীকী প্রতিবাদ পুরো ব্যবস্থাকেই অস্বীকার করছে।
রাষ্ট্র অবশ্য পুরোনো পথেই হাঁটছে। ইন্টারনেট বন্ধ, গ্রেপ্তার, গুলি। ট্রাম্পের হুমকি, যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা, খামেনির ‘বিদেশি চক্রান্ত’ তত্ত্ব—সব মিলিয়ে ইরান আবার এক বিপজ্জনক চক্রে ঢুকেছে। ইতিহাস বলে, দমননীতি সাময়িকভাবে শাসন টিকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু সমাজের ক্ষত সারাতে পারে না।
তাহলে কি সরকার পতন অনিবার্য? নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট—আজকের ইরান আর ২০২২ সালের এর ইরান এক নয়। আর সেটি ১৯৭৯ সালের ইরান তো নয়ই। আজকের আন্দোলন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি জীবনযাপনের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন। রাষ্ট্র যদি এই সংকেত না বোঝে, যদি প্রতিবাদকে শুধু শত্রু মনে করে, তাহলে একদিন এই গণজাগরণই বিপ্লবে রূপ নিতে পারে।
এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা। ধর্ম ও রাষ্ট্রক্ষমতার জটিল সম্পর্ক, ভিন্নমত দমনের প্রবণতা, দীর্ঘদিনের অব্যক্ত ক্ষোভ—এসব উপেক্ষা করলে যেকোনো সমাজই একদিন বিস্ফোরণের মুখে পড়ে। ইরান আমাদের দেখাচ্ছে, আদর্শের মোহে বাস্তবতাকে অস্বীকার করলে ইতিহাস কতটা নির্মম হতে পারে।
ইরানের রাস্তায় আজ যে আগুন জ্বলছে, তা শুধু সরকার পতনের নয়—এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার লড়াই। সেই লড়াইয়ের ফল কী হবে, সময়ই বলবে। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত—এই আগুন আর আগের মতো সহজে নিভবে না।
- প্রশান্ত কুমার শীল: শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সূত্র: ঢাকা পোস্ট

