‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া গাছ কাটলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে গাছে পেরেক বা কোনো ধাতব বস্তু লাগিয়ে ক্ষতিসাধন করলে সর্বোচ্চ বিশ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। বন সংরক্ষণ কর্মকর্তার অনুমোদন ছাড়া সরকারি, সামাজিক কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো গাছ কাটা যাবে না।
অনুমোদন পেতে আবেদনকারীকে গাছের প্রজাতি, সংখ্যা, উচ্চতা এবং গাছ কাটার যৌক্তিক কারণ উল্লেখ করে নির্ধারিত ফরম পূরণ করতে হবে। আবেদন যাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ৩০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাবে। তবে বিপদাপন্ন বা নিষিদ্ধ তালিকাভুক্ত কোনো প্রজাতির গাছ কোনো অবস্থাতেই কাটা যাবে না। এই আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তারা।
আইনটির এই কঠোর ভাষা একজন সখের বৃক্ষপ্রেমিককে নিঃসন্দেহে আনন্দিত করতে পারে। কিন্তু একজন বাস্তববাদী পরিবেশ সচেতন নাগরিকের কাছে, বাংলাদেশের বিদ্যমান প্রশাসনিক সক্ষমতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনায় নিলে, এ আইন অনেকটাই রোমান্টিক উচ্চারণ বলেই প্রতীয়মান হয়।
‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ কাগজে যতটা দৃঢ়, মাঠপর্যায়ে তা যে ততটাই নরম হবে—সে আশঙ্কা অমূলক নয়। পেরেক মারলে ২০ হাজার টাকা কিংবা নিষিদ্ধ ও বিপদাপন্ন গাছ কাটলে এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান সংখ্যার বিচারে সংগত মনে হলেও, বাংলাদেশের নগর, মফস্বল ও গ্রামীণ বাস্তবতায় আইন প্রয়োগকারী জনবল ও তদারকি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার আলোকে এসব শাস্তি প্রায় হাস্যকর।
বড় উন্নয়ন প্রকল্প, প্রভাবশালী ঠিকাদারি চক্র ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার বিরুদ্ধে এ ধরনের জরিমানা কার্যত দায়সারা শাস্তির বেশি কিছু নয়—বরং সরকারের ‘টেকসই উন্নয়ন’-সংক্রান্ত শব্দচয়নের এক ধরনের কোমল, প্রতীকী প্রয়াস বলেই প্রতীয়মান হয়।
অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রজাতি, সংখ্যা, উচ্চতা ও কাটার কারণ উল্লেখ করে ফরম পূরণ এবং ৩০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সৃষ্ট বিলম্বের দিকেই ইঙ্গিত করে। এই কালক্ষেপণই শেষ পর্যন্ত অবৈধ বন ও বৃক্ষ নিধনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে ‘বৃক্ষ সংরক্ষণ কর্মকর্তা’ হিসেবে পুনঃনামকরণ প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের বাইরে কিছু নয়; ক্ষমতার সুস্পষ্ট বণ্টন, আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয় ও কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো নিশ্চিত না হলে এ উদ্যোগও নিছক রোমান্টিকতা হয়েই থাকবে।
একইভাবে, সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গাছ কাটায় পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করলেই আইন কার্যকর হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা, প্রমাণ সংরক্ষণ, দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সংস্কৃতি। বিপদাপন্ন ও নিষিদ্ধ প্রজাতির তালিকা শুধু গেজেটে প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়; তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ, প্রকাশ্য জিও-ট্যাগিং, নাগরিক হটলাইন এবং স্পট-ফাইনের ব্যবস্থা ছাড়া এর বাস্তব ফলাফল শূন্যই থেকে যাবে।
সারকথা, আইন ভালো—কিন্তু শাস্তি দুর্বল; প্রক্রিয়া দীর্ঘ—কিন্তু সময় সংবেদনশীল নয়; আর বাস্তবায়ন কাঠামো অপর্যাপ্ত। ফলে এই অধ্যাদেশের সম্ভাব্য ফলাফল আজও একটি বড়সড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়েই রয়ে যায়।
তাহলে বাংলাদেশের বৃক্ষ সংরক্ষণে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত?
প্রথমত, ‘গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান’—প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রচনা লেখার জন্য যে সীমিত পড়াশোনা করেছি, সেখান থেকে জ্ঞানের ব্যাপ্তি কিছুটা বাড়াতে হবে। সবার আগে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত: বাংলাদেশ কেন বৃক্ষ রক্ষা করবে? এটি কি কেবল নৈতিক দায়, নাকি আমাদের নিজস্ব প্রয়োজনেই জরুরি? প্রথমে এই উত্তরটি খোঁজা যাক।
আসলে রাশিয়া ও কানাডার কাছে বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক বনভূমি রয়েছে—সম্মিলিতভাবে যার পরিমাণ ১১০ কোটি হেক্টরেরও বেশি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ‘মেগা-ফায়ার’ বা ভয়াবহ দাবানলের কারণে এসব অঞ্চল ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। যদিও এগুলো জলবায়ুজনিত বলা হয়, তবু এর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্বও প্রচলিত—কারণ দাবানলে নিধন হওয়া বনভূমি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো পরবর্তীতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করে।
দাবানলে উজাড় হওয়া বনাঞ্চল পরে কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা অনুসন্ধান করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উভয় দেশই প্রায় ২.৫ কোটি হেক্টর অক্ষত বন হারিয়েছে; বিশেষত রাশিয়ার ২০২১ এবং কানাডার ২০২৩ সালের রেকর্ড ভাঙা দাবানল বনের উপরিভাগে অভূতপূর্ব ক্ষতি সাধন করেছে—সবই কথিত জলবায়ুজনিত মেগা-ফায়ারে।
অপর পক্ষে, ব্রাজিল ও কঙ্গো (ডিআরসি) বিশ্বের সবচেয়ে ঘন কার্বন–সমৃদ্ধ প্রাথমিক বনভূমির আবাসস্থল। কঙ্গোর বন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হলেও ২০০২ সাল থেকে দেশটি মূলত ক্ষুদ্র কৃষিকাজের কারণে ৭৪ লাখ হেক্টর প্রাথমিক বন হারিয়েছে। পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে এসব বন পৃথিবীর জলবায়ু রক্ষার শেষ ঢাল।
রাশিয়ার বন একটি বিশাল কার্বন ভল্ট হিসেবে কাজ করে—যেখানে প্রায় ৩২৩ গিগাটন কার্বন সঞ্চিত—আর কঙ্গো অববাহিকা প্রতিবছর প্রায় ১.১ গিগাটন কার্বন শোষণ করে। তবে ২০২৪ সাল ছিল একটি বড় ‘বিপদসংকেত’; কারণ সে বছর প্রথমবারের মতো ক্রান্তীয় বন ধ্বংসের প্রধান কারণ হিসেবে কৃষিকাজের বদলে দাবানল সামনে আসে।
এই অগ্নিকাণ্ড থেকে নির্গত কার্বনের পরিমাণ ভারতের বার্ষিক জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের সমান, যা প্রমাণ করে—জরুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া এসব প্রাচীন বন কার্বন শোষকের পরিবর্তে কার্বন নিঃসরণকারীর আধারে পরিণত হতে পারে।
মোদ্দা কথা হলো, বইতে অর্থনীতি বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণকে অর্থনৈতিক লাভের ঊর্ধ্বে স্থান দিলেও বাস্তবে বিশ্বের কোথাও এর প্রতিফলন নেই। ফলে বাংলাদেশ যদি শুধু আইন করে বনভূমি রক্ষা করতে চায়, তবে তা মুখ থুবড়ে পড়াই স্বাভাবিক। বরং বাংলাদেশের উচিত হবে বনায়নকে বন নিধনের চেয়ে অধিক লাভজনক করে তোলা। এর জন্য কয়েকটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।
যেমন—যেসব কৃষিজমির চারপাশে পরিকল্পিতভাবে ফসলবান্ধব প্রজাতির বড় বৃক্ষ থাকবে, সেগুলোর খাজনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রেয়াত দেওয়া। অনুরূপভাবে শহরাঞ্চলে দালানের ছাদ বা টেরেসে পর্যাপ্ত পরিমাণ নির্দিষ্ট আকারের ও কার্বন-কার্যকরী গাছ থাকলে ওই দালানের খাজনায় রেয়াত দেওয়া।
সরকারি সব প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা। জায়গাভেদে ও বাস্তবতা বিবেচনায় খাদ্যশস্যের পরিবর্তে ফলদ ও অন্যান্য বৃক্ষজাতীয় আবাদে সর্বোচ্চ প্রণোদনা প্রদান করা। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে আঞ্চলিকভাবে আহরিত কাঠের আসবাবপত্র বিপণন ও ক্রয়ে উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
আর বাংলাদেশে সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় বৃক্ষ নিধন পুরোপুরি বন্ধ করার চেয়ে ‘পরিকল্পিত সম্পদ আহরণ ও বৈজ্ঞানিক পুনরোপণ’ বা টেকসই বন ব্যবস্থাপনা বেশি কার্যকর হতে পারে। গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের তথ্যমতে, শুধুমাত্র কঠোর নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় বনদস্যুতা ও অবৈধ দখলদারিত্ব উসকে দেয়। অন্যদিকে, জার্মানি ও সুইডেনের মতো দেশগুলো ‘কন্টিনিউয়াস কভার ফরেস্ট্রি’ (Continuous Cover Forestry) মডেল ব্যবহার করে বনের বাস্তুসংস্থান অক্ষুণ্ন রেখেই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে।
ভুটান তার ৬০ শতাংশ বনভূমি সংরক্ষণের পাশাপাশি পরিকল্পিত পর্যটন ও সীমিত কাঠ সংগ্রহের মাধ্যমে কার্বন-নেগেটিভ মর্যাদা ধরে রেখেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুন্দরবন বা লাউয়াছড়ার মতো সংবেদনশীল এলাকায় বৃক্ষ নিধন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকা উচিত।
তবে অন্যান্য সংরক্ষিত বনে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে (Social Forestry) নির্দিষ্ট চক্রে গাছ কাটা এবং দ্রুত বর্ধনশীল দেশি প্রজাতির গাছ রোপণ করা হলে বন উজাড় কমবে। এই মডেলে বন থেকে অর্জিত আয়ের অংশ স্থানীয়রা পেলে তারা নিজেরাই বনের পাহারাদার হিসেবে কাজ করবে—যা কেবল আইন দিয়ে বন রক্ষার চেয়ে অনেক বেশি টেকসই সমাধান।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বব্যাপী বন সংরক্ষণের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেবল কঠোর দমনমূলক আইন বা নিবারণমূলক ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি সফল হয়নি। বরং উৎসাহ ও প্রণোদনার নীতি বন রক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। কোস্টারিকা তার অন্যতম সফল উদাহরণ।
আশির দশকে দেশটিতে বন উজাড়ের হার বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ ছিল। পরবর্তীতে, ১৯৯৭ সালে তারা ‘পেমেন্ট ফর ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস’ (PES) কর্মসূচি চালু করে। এতে বনের মালিকদের বন না কাটার জন্য সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়। ফলে দেশটির বনভূমি ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৫২ শতাংশের উপরে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশে ১৯২৭ সালের ব্রিটিশ আমলের দমনমূলক ‘বন আইন’ দিয়ে বন রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও দারিদ্র্যের কারণে বন দখল রোধ সম্ভব হয়নি। তবে বাংলাদেশে ‘সামাজিক বনায়ন’ (Social Forestry) একটি অত্যন্ত সফল প্রণোদনামূলক উদাহরণ।
১৯৮০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বনের অংশীদার করা হয়। বন বিভাগ ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে চুক্তি হয় যে, গাছ বড় হলে বিক্রির লভ্যাংশের ৪৫ শতাংশ স্থানীয় অংশীদাররা পাবে। বন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ পর্যন্ত সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে কয়েক লাখ মানুষ উপকৃত হয়েছেন। অনেক প্রান্তিক মানুষ এককভাবে ৮–১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ পেয়েছেন। এই আর্থিক প্রণোদনার কারণে মানুষ এখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে গাছ পাহারা দেয়।
দমনমূলক আইনে মানুষকে বন থেকে দূরে রাখা হয়, ফলে তারা বনকে ‘শত্রু’ মনে করে। প্রণোদনা দিলে মানুষ বনকে নিজের সম্পদ হিসেবে দেখবে। বাংলাদেশে বন সংলগ্ন মানুষের প্রধান সমস্যা হলো দারিদ্র্য। বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা—যেমন ইকো-ট্যুরিজম বা মৌচাষে সহায়তা—হলে তারা গাছ কাটা বন্ধ করবে।
লেখার শুরুতে উল্লেখ করা সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গও প্রযোজ্য—পুলিশ পাহারায় চব্বিশ ঘণ্টা বন রক্ষা অসম্ভব। তবে সচেতন ও লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী বনের সবচেয়ে বড় পাহারাদার হয়ে উঠবে।
- ড. এ কে এম মাহমুদুল হক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। সূত্র: ঢাকা পোস্ট

