জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ যেসব দেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ মোট জিডিপির সমান বা তার চেয়েও বেশি, সেগুলোর উচিত রাজস্ব ঘাটতি কমিয়ে আনা। যাতে করে ঋণ ভীতিকর মাত্রায় না পৌঁছায়। কারণ সুদহার বাড়লে এ সমস্যা আরো গুরুতর হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে পুরনো ঋণ পুনঃঅর্থায়নের সময় সরকারের রাজস্ব ঘাটতি আরো বেড়ে যায়। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো তথাকথিত ‘ডুম লুপ’-এর আশঙ্কা, যেখানে উচ্চ সুদহারের কারণে ঘাটতি বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে বাড়তে থাকা ঘাটতি সরকারি ঋণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে তোলে। এর প্রভাবে সরকারি ঋণের সুদহার আরো বেড়ে যায়।
নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বাজারে সুদহার বেড়ে যাওয়া ‘ডুম লুপ’-এর আশঙ্কায় থাকা সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা হতে পারে। যাতে সরকার রাজস্ব ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ নেয়। আর সুসংহত রাজস্ব আহরণ নিশ্চিতের জন্য কঠোর মিতব্যয়ী নীতি গ্রহণ করতে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টকর। আর ভোটারদের এমন কষ্টকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করানোর আগ্রহ খুব কমসংখ্যক রাজনীতিবিদের মধ্যে দেখা যায়।
আর এ কষ্টকর বাস্তবতাকে বিলম্বিত করার প্রয়াসে অতীতে কোনো কোনো সরকারকে এ ঋণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপিয়ে দিতে দেখা গেছে। এর অর্থায়ন হতো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে রিজার্ভ ইস্যুর মাধ্যমে, যাকে সাধারণ ভাষায় বলা হয় ‘টাকা ছাপানো’। এতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বেড়ে যায় ব্যবসা পরিচালনা ও ভোক্তাদের ব্যয়। ফলে শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হয়। লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি ঠেকিয়ে অর্থনীতিতে স্বস্তি ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নীতি সুদহার বাড়িয়ে দিতে হয়। এতে রাজস্ব পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। কারণ উত্থান ও পতনের এ চক্র অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আর সরকারকে বহন করতে হয় বেশি ঋণ-পরিষেবা ব্যয়। শেষ পর্যন্ত এসব দেশ বাস্তবতা উপলব্ধি করে সরকারে ঘাটতি পূরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি অর্থায়নকে নিষিদ্ধ করে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এ ধরনের অর্থায়ন আবারো ফিরে এসেছে। ২০০৭-০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর নীতি সুদহার শূন্যের নিচে খুব বেশি নামানো সম্ভব হয়নি। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরকারি বন্ড কিনে অর্থনীতিকে গতিশীল করার সিদ্ধান্ত নেয়। ধারণা ছিল, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি বন্ড বিক্রি করে পাওয়া অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হিসেবে বিতরণ করবে। ফলে অর্থনীতিতে গতি আসবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভও বিপুলভাবে বেড়ে যাওয়ায় তারল্য সংকটের আশঙ্কা দূর হবে, যা ঋণপ্রবাহ বাড়ানোয় আরো সহায়ক ভূমিকা নেবে।
এ ধরনের কর্মসূচির সমর্থক এসব পদক্ষেপকে উল্লেখ করেন ‘কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং’ (কিউই) হিসেবে। এগুলোকে সরকারি ঘাটতি পূরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়ন হিসেবে বিবেচনায় নেননি তারা। যদিও এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারি বন্ডই কিনে নিচ্ছিল, তবে তা সরাসরি সরকারের কাছ থেকে নয়। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকারের আসলে এ অর্থায়নের প্রয়োজনই ছিল না। তাদের যুক্তি ছিল, কিউই ছিল পুরোপুরি একটি মুদ্রানীতি-সংক্রান্ত পদক্ষেপ; আর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহজেই ‘কোয়ান্টিটেটিভ টাইটেনিং’ (কিউটি) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব বন্ড বিক্রি করে দিতে পারবে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কিউই বাস্তবায়ন করা যতটা সহজ ছিল, কিউটি ততটা সহজ হয়নি। ২০০৮ সালের শেষ দিক থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিন দফা কিউই কর্মসূচির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের কাছে ট্রেজারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ ৮০০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় আড়াই ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে। কিন্তু ২০১৮ সালে ফেড যখন কিউটির মাধ্যমে এ সম্পদ কমানোর চেষ্টা করে, তখন বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত বাজার ধসে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই ফেড আবার বন্ড কেনা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে কভিড-১৯ মহামারীকালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করলে ফেডারেল রিজার্ভ ফের সরকারের পাশে দাঁড়ায়। ফলে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে ফেডের হাতে থাকা ট্রেজারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চাঙ্গা ও মূল্যস্ফীতি এখনো বেশি। ফলে এটিকে ফেডারেল রিজার্ভের হাতে থাকা সরকারি বন্ড কমানোর উপযুক্ত সময় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ফেড শুধু যে সর্বশেষ কিউটি কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে তা-ই নয়, বরং তাদের ট্রেজারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ এখনো ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে স্থির আছে, যা ২০০৮ সালের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আরো ট্রেজারি বিল কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ফেড; এর সূচনা হিসেবে জানুয়ারিতে ৪০ বিলিয়ন ডলারের বন্ড কেনার ঘোষণা দেয়া হয়। যে সময় মূল্যস্ফীতি ও সরকারের অর্থায়ন চাহিদা—দুটোই ছিল কম, তখন এ পদক্ষেপকে দেখা হয়েছিল মুদ্রানীতিগত উদ্যোগ হিসেবে। সেটিকেই এখন উল্টো অনেকের কাছে রাজস্ব ঘাটতির অর্থায়ন বলে মনে হচ্ছে।
এক্ষেত্রে ফেড বলতে পারে, তারা কেবল অর্থনীতিতে অর্থের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সহায়তা করছে, যা ২০০৮ সালের পর থেকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে। কিন্তু এ তারল্য চাহিদা পূরণ করতে গিয়েই পরোক্ষভাবে রাজস্ব ঘাটতির অর্থায়ন করা হচ্ছে। সাধারণভাবে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের স্বাভাবিক ধারক হলো পেনশন তহবিল ও বীমা কোম্পানিগুলো, যাদের দায়ও দীর্ঘমেয়াদি। তবে আমার বুথ স্কুলের সহকর্মী অনিল কাশ্যপ ও তার সহলেখকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারি বন্ডের সুদহার খুব একটা আকর্ষণীয় নয়। বরং অতিরিক্ত মুনাফার আশায় প্রতিষ্ঠানগুলো করপোরেট বন্ডে বিনিয়োগ করে থাকে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি করপোরেট বন্ড তুলনামূলকভাবে কম থাকায় তারা স্বল্পমেয়াদি করপোরেট বন্ড কেনে এবং ট্রেজারি বন্ডের ফিউচার্সের মাধ্যমে মেয়াদ বা ‘ডিউরেশন’ বাড়িয়ে নেয়।
এ প্রতিষ্ঠান যখন বিপুল পরিমাণে ফিউচার্স বিক্রি করতে যায়, তখন একটি জটিল ‘রুব গোল্ডবার্গ মেশিন’-এর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। হেজ ফান্ডগুলো নিজেদের সুরক্ষা দিতে সরকারি বন্ড ক্রয় করে, যার অর্থায়ন হয় রিপারচেজ মার্কেটের বিপুল অংকের স্বল্পমেয়াদি ঋণ দিয়ে। এ ঋণ কার্যক্রম চলমান রাখতে কাজে লাগানো হয় ফেডের সরবরাহকৃত তারল্যকে। সেক্ষেত্রে এটি বিশ্বাস করা কঠিন যে ফেড সরকারের বাজেট ঘাটতির অর্থায়নে মূল ভূমিকা পালন করছে না, বরং নিজস্ব বন্ডের মাধ্যমে এবং পরোক্ষভাবে হেজ ফান্ডের জন্য প্রয়োজনীয় তারল্য সরবরাহ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে যে এখনই কোনো ‘ডুম লুপ’ আসন্ন এ কথা কেউ কেউ বলছে। তবু যখন সরকারি ঋণের সুদহার স্বাভাবিক মাত্রার নিচে কমিয়ে রাখা হচ্ছে, আবার ঘাটতি কমানোর জন্য কংগ্রেসের কাছে উপায়ও আছে সামান্য, তখন এ ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা তো তৈরি হয়ই। উপরন্তু ফেড যখন নিজের হাতে থাকা সরকারি বন্ডকে প্রতিদিনই পুনঃমূল্যায়িত হচ্ছে এমন রিজার্ভ দিয়ে অর্থায়ন করে, তখন সুদহার বাড়লে ফেডের নিজের ক্ষতিই দ্রুত মাত্রায় বেড়ে যায়। এতে ‘ডুম লুপ’ আরো ত্বরান্বিত হয়ে ওঠে। আর যেহেতু সরকারি বন্ডের সুদহার পেনশন তহবিল ও বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে আকর্ষণীয় নয়, সেহেতু হেজ ফান্ডগুলোকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডে অর্থায়ন করতে হচ্ছে স্বল্পমেয়াদি ঋণের মাধ্যমে। এটি স্থিতিশীলতার জন্য মোটেও ভালো নয়।
ফেডারেল রিজার্ভই একমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারের ঘাটতি অর্থায়নে যুক্ত। বর্তমান পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য উদ্বেগজনক প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে, যেমন পর্যাপ্ত রিজার্ভ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি কি সরকারি ঋণ অর্থায়নের স্থিতিশীলতাকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে? নিজ নিজ অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার স্বার্থেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে এ বিষয়ে আরো স্পষ্ট ও কার্যকর সমাধান থাকা প্রয়োজন।
লেখক: রঘুরাম জি. রাজন: রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) সাবেক গভর্নর ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান অর্থনীতিবিদ; শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বুথ স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক। সূত্র: বণিক বার্তা

