এসিআইতে সাধারণ কর্মী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, ২৫ বছর পর এখন সুব্রত রঞ্জন দাস এসিআই মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। নিজে কীভাবে এত দূর পৌঁছেছেন, এসিআই মোটরসকে কোথায় নিয়ে যেতে চান—সম্প্রতি তিনি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
প্রশ্ন: আপনি এসিআই মটরসে্র ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেন, যেটি এসিআই গ্রুপের একটি কোম্পানি। এত দূর আসতে কোন কোন বিষয় বড় ভূমিকা রেখেছে?
সুব্রত রঞ্জন দাস: প্রথম বিষয় হলো, নিজের কাজটি কতটা নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য জরুরি, সেটা অনুধাবন করা এবং মাথায় রাখা। যখন আমি কাজটি শুরু করি, তখন সেটা নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য কাজে লেগেছে। আমি পড়াশোনা করেছি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল বিভাগে। তখন এই বিষয়ের শিক্ষার্থীদের তেমন কোনো কর্মবাজার ছিল না। পড়াশোনা যখন খুব বেশি কাজে লাগাতে পারছিলাম না, তখন বিপণনে কাজ শুরু করি। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো সোশ্যাল স্কিল (সামাজিক ও যোগাযোগদক্ষতা)। এটা দিয়ে আমি টিকে থাকার চেষ্টা করেছি।
সুব্রত রঞ্জন দাস: আমি প্রথম কাজ শুরু করি ব্র্যাকে, রিজওনাল সেক্টর স্পেশালিস্ট হিসেবে। কাজ করেছি কৃষি, বিশেষত সবজি চাষ সম্প্রসারণে। কৃষি অর্থনীতি আমি অতটা পড়িনি, কিন্তু দ্রুত শিখে নিয়েছি। একটা সময় দেখলাম, যাঁরা কৃষি অর্থনীতিতে পড়েছে, তাঁদের চেয়ে আমার পারফরম্যান্স (পারদর্শিতা ও অর্জন) ভালো। তারপর এসিআইতে আমি বীজ বিক্রি বিভাগে যোগ দিই। পদ ছিল মার্কেটিং অফিসার (বিপণন কর্মকর্তা)। কাজ ছিল কুমিল্লায়। বিপণন বিভাগে ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ ও অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারলে ভালো করা যায়। সেটা আমি করতে পেরেছি। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে আমার ফলাফল বেশ ভালো ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তেমন পড়াশোনা করিনি। তখন সামরিক শাসনের কারণে পড়াশোনা শেষ করতে দেরি হয়েছে। চাকরিতে যোগ দিয়ে আমি দুটি বিষয় মাথায় রেখেছি; প্রথমত, আমি অনেক কিছু হারিয়েছি। আর হারানো যাবে না। দ্বিতীয়ত, আমি যাঁদের সঙ্গে কাজ করছিলাম, তাঁদের চেয়ে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি ছিল। ফলে তাঁদের চেয়ে ভিন্ন কিছু করতে হবে, এমন তাগিদ ছিল। এই দুটি বিষয় আমাকে তাড়িত করেছে।
সুব্রত রঞ্জন দাস: এসিআইতে নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখা যায় ‘বিজনেস ডিরেক্টর’ পদ থেকে। সেখানে আসতে ১৫ বছর লেগেছে। আমি নির্বাহী পরিচালক হয়েছি আট বছর আগে। আর মার্কেটিং অফিসার থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হতে মোট ২৫ বছর লেগেছে।
সুব্রত রঞ্জন দাস: আপনি ঠিকই শুনেছেন। শুরুতে নাম ছিল এসিআই অ্যাগ্রি মেশিনারিজ। ১০ থেকে ১৫ দিন পরে নাম পরিবর্তন করে এসিআই মটরস্ করা হয়। এসিআই কর্তৃপক্ষ আমাকে সুযোগটি দেয়। শুরুতে খুব স্বল্প মূলধন দেওয়া হয়েছিল।
সুব্রত রঞ্জন দাস: এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আছে। তবে নিজের ভূমিকা বড়। কারণ, আপনাকে তো আগে দেখাতে হবে আপনি ‘পারফর্ম’ করতে পারেন। আপনি পারলে এসিআই আপনার পেছনে বিনিয়োগ করবে। এটা এমন একটা প্রতিষ্ঠান যেখানে আপনি প্রাথমিক পর্যায়ে শুরু করে শীর্ষস্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত যেতে পারবেন। তবে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।
সুব্রত রঞ্জন দাস: এসিআই মটরস্ এখন কৃষি যন্ত্রপাতি খাতের সবচেয়ে বড় কোম্পানি। মোটরসাইকেলের বাজারে বিগত ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে ইয়ামাহা মোটরসাইকেল, যেটি এসিআই বিক্রি করে। নির্মাণ সরঞ্জাম, বাণিজ্যিক যানবাহন ও অন্যান্য পণ্য বিক্রিতেও আমরা ভালো করছি। সব মিলিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমরা ৩ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করেছি। কর–পরবর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৯০ কোটি টাকা। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি উৎসাহজনক নয়, তার মধ্যে এই অর্জন দারুণ। সব মিলিয়ে এসিআই গ্রুপের মধ্যে অন্যতম লাভজনক কোম্পানি এসিআই মটরস্।

সবচেয়ে বড় অর্জন, এসিআই মটরস্ বাংলাদেশের একটি ‘চেঞ্জমেকার’ (যারা পরিবর্তন আনে) প্রতিষ্ঠান। এ দেশের কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণে বড় পরিবর্তন এসেছে, যেখানে বড় ভূমিকা রেখেছে এসিআই মটরস্। বাংলাদেশে এখন ৪০ শতাংশের জমি এসিআইয়ের বিক্রি করা ট্রাক্টর অথবা পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ হয়। একটা ট্রাক্টর এক ঘণ্টায় এক একরের বেশি জমি চাষ করে, যা লাঙল দিয়ে করতে আড়াই দিন লাগত। ট্রাক্টরে এক একর জমি চাষ করতে খরচ দেড় হাজার টাকার মতো। লাঙলে লাগে ১০ হাজার টাকার বেশি। ধান বা অন্য শস্য কাটার জন্য আমরা নিয়ে এসেছি কম্বাইন্ড হারভেস্টর। এখন দেশের ১৫ শতাংশের বেশি জমির শস্য এসিআইয়ের হারভেস্টর দিয়ে কাটা হয়। সময় কম লাগে, খরচ কম হয়। শস্যও কম নষ্ট হয়। এসিআই মটরসে্র বর্তমানে দুই হাজার কর্মী কাজ করে। এঁদের গড় বয়স ২৮–এর কম। বলতে পারেন, এটি তরুণদের নিয়ে পরিচালিত একটি কোম্পানি।
সুব্রত রঞ্জন দাস: আমরা শুরু করার আগে দেশে ইয়ামাহা মোটরসাইকেল বিক্রি হতো বছরে পাঁচ হাজারের মতো। এখন সেটা এক লাখে উন্নীত হয়েছে। ছয় মাস ধরে আমরা বাজারে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছি। শুরু থেকে আমরা জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব মডেলের মোটরসাইকেল বিক্রিতে জোর দিয়েছি। আমাদের হিসাবে, আড়াই লাখ টাকার একটা মোটরসাইকেল পাঁচ বছরে প্রায় এক লাখ পঁচিশ হাজার টাকার জ্বালানি তেল সাশ্রয় করে। সে হিসাবে আমাদের বিক্রীত ইয়ামাহার পাঁচ লাখ মোটরসাইকেল সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি টাকার জ্বালানি সাশ্রয় করে। বাংলাদেশে ইয়ামাহা রাইডার ক্লাব যেকোনো দুর্যোগে মানুষের পাশে থাকে।
সুব্রত রঞ্জন দাস: জাপানের ইয়ামাহার সবচেয়ে বড় পরিবেশক এসিআই মটরস্। আমরাই একমাত্র পরিবেশক, যাদের কারিগরি সহযোগী হয়েছে ইয়ামাহা। ভারতে ইয়ামাহার বাজার হিস্যা সাড়ে তিন শতাংশ। বাংলাদেশে ২১ শতাংশ। বিপণন কার্যক্রমে আমরা দুবার গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছি—একবার ট্রাক্টর সরবরাহ করে, একবার মোটরসাইকেলের সবচেয়ে বড় লোগো তৈরি করে। ইয়ামাহা এসব বিষয় আমাদের প্রশংসা করে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তা তুলে ধরে।
সুব্রত রঞ্জন দাস: তিনটি জায়গায় আমরা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছি। প্রথমত, খরচ বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা কমে গেছে। দ্বিতীয়ত, মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলে আনতে সময় বেশি লাগছে। তৃতীয়ত, ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ হয়ে গেছে।
সুব্রত রঞ্জন দাস: কিছু কিছু বিনিয়োগ করা হচ্ছে। মূলত উৎপাদন সক্ষমতার সম্প্রসারণের জন্য। বড় বিনিয়োগ এখন নয়।
সুব্রত রঞ্জন দাস: একে তো অর্থায়নের অভাব। তার ওপর ক্রেতার আস্থা পরিস্থিতি দেখতে হচ্ছে। সেটা আবার দেশের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। যেকোনো বিনিয়োগকারী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিনিয়োগ করাকে সুবিবেচনাপ্রসূত বলে মনে করবে।
সুব্রত রঞ্জন দাস: পাঁচ বছরে এসিআই মটরসে্র ব্যবসাকে ‘বিলিয়ন ডলারে’ (শত কোটি ডলার বা ১২ হাজার কোটি টাকা) নিতে চাই, যেখানে কাজ করবে ১০ হাজার মানুষ। আমি চাই এসিআই মটরস্ ‘বেস্ট এমপ্লয়ারে’ (সেরা নিয়োগকারী) পরিণত হোক, যেটা কর্মীরা অনুভব করবে। বাংলাদেশের কৃষির রূপান্তরে এখনো অনেক পথ যেতে হবে, আমরা তাতে ভূমিকা রাখতে চাই।
সুত্র: প্রথম আলো

