চলতি মাসেই অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা হবে। ব্যবসায়ীরা দাবি জানাচ্ছেন, সুদের হার কমানো ছাড়া বিকল্প নেই। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক নীতির কারণে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.৫৮ শতাংশ। খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগে যেসব ফান্ডে সুদ ছিল না, এখন ব্যাংক ১৫ শতাংশের বেশি সুদ চাপাচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং উৎপাদনমুখী খাতগুলো প্রভাবিত হচ্ছে। হাতেম আরও বলেন, “ঋণের নতুন নিয়মের কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। স্থিতিশীলতা রক্ষা ও বিনিয়োগ বাড়াতে নমনীয় মুদ্রানীতি জরুরি। সম্প্রতি তিনি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি নিয়ে কথা বলেছেন।
প্রশ্ন: চলতি মাসেই অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে। এবারের মুদ্রানীতি কেমন হওয়া উচিত?
মোহাম্মদ হাতেম: বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারাবাহিক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। মুদ্রানীতির প্রভাবে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এ ধারা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ায় খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এমন বাস্তবতায় এবারের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার কমানো ছাড়া বিকল্প নেই।
প্রশ্ন: আসন্ন মুদ্রানীতিতে আপনাদের প্রধান দাবিগুলো কী কী?
মোহাম্মদ হাতেম: বাংলাদেশ ব্যাংক গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে আসছে। এতে নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশের উপরে তোলা হয়েছে। এর প্রভাবে ব্যাংকঋণের সুদহার ১৫ শতাংশের বেশি হয়ে গেছে। এই অবস্থায় আমাদের প্রথম এবং প্রধান দাবি হচ্ছে সুদের হার কমিয়ে আনা। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে নানা ধরনের সংকট ও সমস্যা বিদ্যমান। রপ্তানিকারক হিসেবে আমরা ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বিভিন্নভাবে সুদের বিষয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছি। আগে যেসব ফান্ডে কোনো সুদ লাগত না, ব্যাংকগুলো এখন সেগুলোতেও সুদ ধার্য করছে।
প্রশ্ন: ব্যাংকগুলো ঠিক কীভাবে সুদ আরোপ করে আপনাদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে? কোনো সুনির্দিষ্ট উদাহরণ কি দেওয়া যায়?
মোহাম্মদ হাতেম: আগে আমরা যখন এক্সপোর্ট ডকুমেন্ট দিয়ে পারচেজ করতাম এবং টাকা নিতাম, তখন ব্যাংক সেই টাকার ওপর কোনো সুদ নিত না। কিন্তু এখন তারা সেটিকে শর্ট টার্ম লোন বা এসটিএল হিসেবে গণ্য করছে এবং তার ওপর ১৫ শতাংশের বেশি সুদ চার্জ করছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের ওপর এই বাড়তি সুদের বোঝা অনেকটা ভরাডুবির মধ্যে থাকা নৌকায় আরও ভারী পাথর চাপিয়ে দেওয়ার মতো, যা ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকে প্রায় অসম্ভব করে তুলছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্পসহ উৎপাদনমুখী খাতগুলোর জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ সুদের হার উৎপাদন ও বিনিয়োগ খাতে ঋণের ভার বাড়াচ্ছে, ফলে সামগ্রিক অর্থনীতির গতিশীলতা ব্যাহত হচ্ছে।
প্রশ্ন: খেলাপি ঋণের বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী?
মোহাম্মদ হাতেম: বর্তমানে ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমায় নতুন নিয়ম চালু হওয়ার ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে। যা অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক যেন এই বিষয়গুলো নজর দেয় এবং খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনে। তবে টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হলে আর্থিক খাতে কাঠামোগত সংস্কার, ঋণ বরাদ্দে স্বচ্ছতা এবং বাজারে তারল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে। সেই সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা, বেসরকারি খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার ও বিনিয়োগ বাড়াতে আরও নমনীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মুদ্রানীতির বিকল্প নেই। সূত্র: খবরের কাগজ

